01/07/2026 রাজশাহী-৬: নীরব বিভক্তিতে বিএনপি
শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন
৫ জানুয়ারী ২০২৬ ১৩:২৭
সংসদীয় ছয়টি আসনের মধ্যে সীমান্তঘেঁষা এলাকা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৬। আসনটি তুলনামূলকভাবে শান্ত হিসেবে পরিচিত। এই আসনে এখনো অন্য পাঁচটি আসনের মতো প্রকাশ্য সংঘাত বা বড় ধরনের উত্তেজনা দেখা যায়নি। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ভেতরে নীরব অসন্তোষ ও ভেতরের বিভক্তি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আসনে বিএনপি এবং জামায়াতের উভয় প্রার্থী সমানভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
চারঘাট ও বাঘা উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৬ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে পুরুষ ও নারী ভোটারের অনুপাত প্রায় সমান। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে আম, পান, ধান ও সবজি উৎপাদনই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ভোটের রাজনীতিতে এখানে ব্যক্তি-ইমেজ, সাংগঠনিক শক্তি এবং দলীয় ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন আবু সাঈদ চাঁদ। তিনি স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। মাঠপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রকাশ্য বিক্ষোভ বা বড় ধরনের বিরোধিতার ঘটনা ঘটেনি।
দলীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ তার পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণায় রয়েছে। তবে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয় গত ১৭ ডিসেম্বর। ওইদিন চারঘাট উপজেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেন জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল। এতে করে রাজশাহী-৬ আসনে বিএনপির ভেতরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও মনোনয়ন না পাওয়ায় তার অনুসারীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ রয়েছে। উজ্জল ছাড়াও আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও বাঘা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নুরুজ্জামান খান মানিক, দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দেবাশীষ রায় মধু, বাঘা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বজলুর রহমান।
যদিও ইতেপূর্বে প্রকাশ্যে কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। আবার জেলা বিএনপির কতিপয় নেতার দখলবাজী- চাঁদাবাজীর কারণে আবু সাঈদ চাঁদের বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের অভিযোগ জেলা বিএনপির কতিপয় নেতার জমি ও বালুমহাল দখল-চাঁদাবাজীর বিরুদ্ধে তিনি নীরব ভূমিকায় রয়েছে। তবে নীরব অসন্তোষ আর আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র উত্তোলন নির্বাচনের ফলাফলে যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অপর দিকে এই পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগাতে তৎপর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মনোনীত প্রার্থী নাজমুল হক। যিনি রাজশাহী পূর্ব জেলার সহকারী সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখ। জামায়াত এখানে তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করে এগোচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির ভেতরের বিভক্তি বাড়লে জামায়াতের ভোট এককভাবে কেন্দ্রীভূত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজশাহী-৬ আসনে অতীতে মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রাধান্য বিস্তার করে এসেছে। তবে জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখানে তৃতীয় শক্তির প্রভাবও বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে সাধারণত বিজয়ের ব্যবধান খুব বেশি নয়, ফলে সামান্য ভোট স্থানান্তরই ফলাফল বদলে দিতে পারে।
তবে জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হক ও বিএনপির প্রার্থী আবু সাঈদ চাঁদ উভয়েই সমান তালে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। গ্রাম ভিত্তিক গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও সাংগঠনিক সভার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। রাজশাহী-৬ আসনের ভোটাররা বলছেন, এখনো পর্যন্ত বড় ধরনের উত্তেজনা না থাকলেও শেষ মুহূর্তে দলীয় বিভক্তির প্রভাব ও ভোটের সমীকরণ কী দাঁড়ায়, সেটিই দেখার বিষয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ ঐক্য দুর্বল হলে জামায়াত এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও শক্ত অবস্থানে নিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজশাহী-৬ আসনে এবার ফল নির্ধারণে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির অভ্যন্তরীণ ঐক্য, জামায়াতের সংগঠিত ভোটব্যাংক, শেষ মুহূর্তে নিরপেক্ষ ভোটারদের অবস্থান। সব মিলিয়ে সীমান্তঘেঁষা শান্ত এই আসনে ভোটের মাঠে দৃশ্যমান উত্তাপ কম হলেও ভেতরের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে সীমান্তের শান্ত আসনে দৃশ্যমান উত্তাপ কম হলেও রাজনৈতিক সমীকরণ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। নীরব অসন্তোষই শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।