30660

06/06/2026 দেশে বাড়ছে ক্যানসার রোগী, কারণ কী?

দেশে বাড়ছে ক্যানসার রোগী, কারণ কী?

রাজ টাইমস ডেস্ক

৬ জুন ২০২৬ ০৯:৫৮

দেশে প্রতিবছরই ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে এক লাখ ১৬ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

একই সময়ে নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন এক লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ। তবে চিকিৎসকদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতিতে আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।

ক্যানসার রোগীর চাপ বাড়ছে দেশের বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গত বছর প্রায় ৪২ হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩১ হাজারই ছিলেন নতুন রোগী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, বর্তমানে দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ৪৬ হাজার, যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর হারও বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ।

শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, শিশুরাও ক্যানসারের ঝুঁকিতে পড়ছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট ক্যানসার রোগীর মধ্যে প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশই শিশু।

২০২৫ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৮ ধরনের ক্যানসার শনাক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে পুরুষদের ক্ষেত্রে ফুসফুস, খাদ্যনালী, মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসার বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে স্তন, জরায়ুমুখ এবং ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি।

কিন্তু সার্বিকভাবে দেশে কোন কোন ধরনের ক্যানসার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সেটার পেছনে কারণ কী, চলুন জেনে নেওয়া যাক।

খাদ্যনালীর ক্যানসার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে খাদ্যনালির ক্যানসারে। ২০২২ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪২ হাজারেরও বেশি।

প্রতিবছর আরও ২৫ হাজারের বেশি মানুষ এই ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ১৫ দশমিক এক শতাংশ। নারীদের তুলনায় পুরুষরাই খাদ্যনালির ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্তের হারের মতো এ ধরনের ক্যানসারে মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর বাংলাদেশে যে সোয়া এক লাখ মানুষ ক্যানসারে ভুগে মারা যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে খাদ্যনালির ক্যানসারে প্রাণ হারাচ্ছেন ২৪ হাজারের বেশি।

আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, বর্তমানে দেশে এমন ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪০ হাজারের কিছু বেশি। এছাড়া প্রতিবছর ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ এই ক্যানসারে নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার এবং নারীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার।

এ রোগে ভুগে প্রতিবছর মারা যাচ্ছেন প্রায় সাড়ে নয় হাজারের মতো মানুষ, যা ক্যানসারের মোট মৃত্যুর প্রায় আট দশমিক এক শতাংশ।

২০২৬ সালে প্রকাশিত জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে আট দশমিক ৭১ শতাংশই এসেছিলেন মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসার নিয়ে।

ফুসফুসের ক্যানসার

মৃত্যুহার বিবেচনায় খাদ্যনালির ক্যান্সারের পরেই রয়েছে ফুসফুসের ক্যানসার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এ ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর বাংলাদেশে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।

সংস্থাটির হিসেবে, বর্তমানে বাংলাদেশে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। প্রতিবছর নতুন করে আরও প্রায় ১৩ হাজার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে দশ হাজার জনই পুরুষ।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল বলছে, ২০২৫ সালে তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে ১৮ শতাংশই ছিল ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত। সংখ্যার হিসেবে সেটি সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি বলে হাসপাতালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্তনের ক্যানসার

বাংলাদেশের নারীরা যেসব ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, সেগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে স্তনের ক্যানসার।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে ক্যান্সার আক্রান্ত নারীদের মধ্যে ৩৬ দশমিক চার শতাংশই স্তনের ক্যানসারে ভুগছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি নারী এ ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত।

প্রতিবছর নতুন করে আরও প্রায় ১৩ হাজার নারী স্তনের ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। সেইসঙ্গে, এর কারণে প্রায় প্রতি বছরই ছয় হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

জরায়ুমুখের ক্যানসার

স্তনের ক্যানসারের পর নারীদের মধ্যে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি জরায়ুমুখের ক্যানসারে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটিতে নারী ক্যানসার রোগীদের মধ্যে ১৯ শতাংশই প্রজনন সম্পর্কিত ক্যানসারে ভুগছেন।

এর মধ্যে ১১ শতাংশই জরায়ুমুখের ক্যানসারে ভুগছেন। এর বাইরে, পাঁচ শতাংশ ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে এবং তিন শতাংশ জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশ এখন সাড়ে ২৬ হাজারেরও বেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যানসারে ভুগছেন। এছাড়া প্রতিবছর আরও প্রায় সাড়ে নয় হাজার নারী এই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। একই সময়ে, পাঁচ হাজার আটশ' জনেরও বেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যানসারের কারণে মারা যাচ্ছেন।

ক্যানসারের বিষয়ে বাংলাদেশে এখনো জাতীয়ভাবে কোনো তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হয়নি। যতটুকু তথ্য উপাত্ত পাওয়া যায়, সেগুলো মূলত বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্তদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশই হাসপাতালে যান না।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বলেন, ফলে ক্যানসার আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যাটা যে আরও বড়, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রতিবছরই ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

পরিবেশ দূষণ এক্ষেত্রে অনেকটা দায়ী বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

ডা. সুমন বলেন, বায়ু দূষণের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যানসার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আর আমাদের দেশের বাতাস যে মাত্রায় দূষিত, তাতে এখানে সুস্থ থাকাটা খুবই কঠিন।

একইসঙ্গে, খাদ্যাভ্যাসসহ মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার কারণেই ক্যানসার বাড়ছে।

ডা. সুমন বলেন, বিশেষ করে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান করা বা তামাকপাতা সেবন ইত্যাদি কর্মকাণ্ড ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আমাদের দেশে ইতোমধ্যে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও সেগুলোর কাভারেজ এখনও অনেক কম। ফলে টিকা কাভারেজ বাড়ানোর পাশাপাশি ক্যানসার বিষয়ে যদি সবাইকে সচেতন করে তোলা যায়, তাহলে নারীদের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার- উভয়ই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

—ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন, পরিচালক, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যদেশের তুলনায় বাংলাদেশের নারীরা কম বয়সে স্তন ও জরায়ুর ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. সুমন বলেন, বিশ্বে যেভাবে ব্রেস্ট ক্যানসার পাওয়া যায় বয়স্ক নারীদের মধ্যে, আমাদের দেশে সেখানে বেশিরভাগ রোগী পাচ্ছি ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে।

তবে সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ এবং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে স্তন ও জরায়ুর ক্যানসার কমানো সম্ভব বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

ডা. সুমন আরও বলেন, আমাদের দেশে ইতোমধ্যে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও সেগুলোর কাভারেজ এখনও অনেক কম। ফলে টিকা কাভারেজ বাড়ানোর পাশাপাশি ক্যান্সার বিষয়ে যদি সবাইকে সচেতন করে তোলা যায়, তাহলে নারীদের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার- উভয়ই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

প্রকাশক ও সম্পাদক : মহিব্বুল আরেফিন
যোগাযোগ: ২৬৮, পূবালী মার্কেট, শিরোইল, ঘোড়ামারা, রাজশাহী-৬০০০
মোবাইল: ০৯৬৩৮ ১৭ ৩৩ ৮১; ০১৭২৮ ২২ ৩৩ ২৮
ইমেইল: [email protected]; [email protected]