31233

08/10/2026 বিদ্যুৎ সংকটে নাজেহাল রাজশাহী ॥ জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি, বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

বিদ্যুৎ সংকটে নাজেহাল রাজশাহী ॥ জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি, বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন

১০ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫২

বিদ্যুৎ সংকটে নাজেহাল রাজশাহীবাসী। তীব্র গরমে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও নাজুক। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও আবার দিনে মাত্র ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার নগরীতেও প্রায় এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে বলে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান। ফলে বিদ্যুৎ সংকট এখন শুধু নাগরিক ভোগান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, শিক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে।

সর্বশেষ প্রকাশিত নেসকোর হিসাব অনুযায়ী, গত ১৭ জুন রাজশাহী মহানগরীতে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫১ মেগাওয়াট। বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যায় ১১১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই দিন শহরেই ঘাটতি ছিল ৪০ মেগাওয়াট, যা মোট চাহিদার প্রায় ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। পিক আওয়ারে নগরীর প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৩-৫৪ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২১-২২ মেগাওয়াট। নেসকোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করতে হয়। নগরীর হুজরাপুর, নয়াগোলা ও বটতলাহাট সাবস্টেশনেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়।

রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটের চিত্র আরও ভয়াবহ। জুনে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে গোদাগাড়ীর কোনো কোনো এলাকায় দিনে মাত্র ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার তথ্য উঠে আসে। বাগমারায় প্রায় ১০ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অভিযোগও পাওয়া যায়। কোথাও দিনের বেলায় বিদ্যুৎ চলে গেলে দীর্ঘ সময় পর ফিরে আসছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গতকাল রোববার পুঠিয়া উপজেলার ঝলমলিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং ভাইভাই গাড়ির মালিক মুকুল জানান সারা দিনে প্রায় ২ থেকে ৩ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে। অর্থাৎ এখানে ২১ ঘন্টাই থাকছে বিদ্যুৎ বিহীন অবস্থায়। দূর্গাপুর উপজেলার জয়কৃষ্ণপুর বাশেদের মোড় এলাকার আরিফ শেখ জানান, এলাকায় দিনে-রাতে ২৪ ঘন্টায় ৫ থেকে ৬ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে। অর্থাৎ ১৭ থেকে ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।


নগরীর উপকন্ঠ নওহাটা বড়গাছী এলাকার পিয়ারুল ইসলাম জানান, ২৪ ঘন্টায় সারাদিনে খুব বেশী হলেও ১০ থেকে ১২ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে। বাকী সময় বিদ্যুৎ বিহীন থাকতে হয়। এদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরে তুলনামূলকভাবে প্রায় এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। ফলে গরমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন ফিরবে, তার কোনো নিশ্চয়তা থাকছে না।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, রাজশাহীর বিদ্যুৎ সংকট শুধু নগর কেন্দ্রিক নয়; শহর ও গ্রাম দুই পর্যায়েই সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে। তবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এর তুলনামূলক বেশি ভুক্তভোগী।

তথ্যমতে, রাজশাহীর বর্তমান সংকটের পেছনে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতিও বড় কারণ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শেষ দিকে দেশে এক পর্যায়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেয়। তখন জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট; বিপরীতে সরবরাহ ছিল প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা আরও বাড়ে। একই সময়ে ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ জাতীয় গ্রিডে ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যায়। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা ওই বন্ধকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণজনিত বলে উল্লেখ করলেও এর প্রভাব পড়ে উত্তরাঞ্চলসহ রাজশাহী বিভাগের বিদ্যুৎ সরবরাহে। তবে শুধু জাতীয় উৎপাদন ঘাটতিকে রাজশাহীর বিদ্যুৎ সংকটের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। স্থানীয় পর্যায়ে সঞ্চালন সক্ষমতা, ফিডার ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, ভোল্টেজের ওঠানামা এবং বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সংকটকে তীব্র করছে।

ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা। কম্পিউটার, ফটোকপি, প্রিন্টিং, ফ্রিজনির্ভর ব্যবসা, খাবারের দোকান, ওয়ার্কশপ, ক্ষুদ্র কারখানা ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। রাজশাহী নগরীর এক কম্পিউটার ব্যবসায়ী জানান, দুপুরের মধ্যেই তাঁর এলাকায় কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লোকসানও বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সমস্যা দ্বিমুখী। বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন ও বিক্রি কমে যায়, কিন্তু দোকান বা কারখানার ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহাল থাকে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর বা ব্যাটারি ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এতে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি সেচনির্ভর হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘ বিরতি হলে কৃষকদের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি রাজশাহীর গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের আরেক অভিযোগ নিম্ন ভোল্টেজ। নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, কখনো কখনো ভোল্টেজ এত কমে যায় যে বৈদ্যুতিক পাখি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চলে না। ভোল্টেজের ওঠানামায় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ থাকলেও মানসম্মত সরবরাহ না থাকায় গ্রাহকদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের সম্ভাব্য লোডশেডিং শিডিউল প্রকাশ করা হয়েছে। ২৯ জুলাই পর্যন্ত ওয়েবসাইট হালনাগাদ থাকার তথ্যও রয়েছে। তবে ৯ আগস্টের জন্য রাজশাহী মহানগরীর নেসকো এলাকায় চাহিদা-সরবরাহের নতুন কোনো নির্দিষ্ট মেগাওয়াটের হিসাব অনলাইনে প্রকাশিত পাওয়া যায়নি। ফলে সর্বশেষ প্রকাশিত নেসকোর হিসাবই বর্তমানে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তুলনামূলক তথ্য ১৭ জুন ১৫১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১১১ মেগাওয়াট সরবরাহ এবং ৪০ মেগাওয়াট ঘাটতি।

বিদ্যুৎ সংকট সাময়িকভাবে লোডশেডিং কমিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নেসকো ও পল্লী বিদ্যুতের বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন, দুর্বল ফিডার ও সাবস্টেশন শক্তিশালীকরণ এবং গ্রামীণ এলাকায় সরবরাহ বৈষম্য কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেচ ফিডারগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ, হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ও অন্যান্য জরুরি জনসেবা প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের প্রকৃত কারণ ও সম্ভাব্য সময় গ্রাহকদের জানানোর ব্যবস্থাও জরুরি।

প্রকাশক ও সম্পাদক : মহিব্বুল আরেফিন
যোগাযোগ: ২৬৮, পূবালী মার্কেট, শিরোইল, ঘোড়ামারা, রাজশাহী-৬০০০
মোবাইল: ০৯৬৩৮ ১৭ ৩৩ ৮১; ০১৭২৮ ২২ ৩৩ ২৮
ইমেইল: [email protected]; [email protected]