ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৯ জুন ২০২১ ০৮:৩০; আপডেট: ৪ আগস্ট ২০২১ ০৫:২০

ছবি: সংগৃহিত

দেশে করোনার ভারতীয় বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে প্রতিদিনই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে মানুষের মধ্যে। একদিনে শনাক্তের হার প্রায় ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা সংস্থা-আইসিডিডিআর,বি’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে শনাক্ত হওয়া করোনা রোগীদের ৬৮ শতাংশই ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত হচ্ছেন। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সমপ্রতি এক তথ্যে বলা হয়েছে, সংক্রমণের ৮০ শতাংশই ভারতীয় বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট।

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সামাজিক সংক্রমণও বিদ্যমান রয়েছে দেশে। করোনাভাইরাসের মহামারিতে এখন দেশে একদিকে টিকার সংকট আর অন্যদিকে ডেল্টা বা ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে আবার উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগী ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।


এসব হাসপাতালে সেবা না পেয়ে ঢাকায় ছুটছেন করোনা রোগীরা। ঢাকাতেও ক্রমশ বাড়ছে সংক্রমণ। ঢাকা জেলায় গত কয়েকদিন করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে বেশি। ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলায়ও একই চিত্র। জনস্বাস্থ্যবিদরা ঢাকায় করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা করছেন।
এদিকে, করোনা সংক্রমণ সমপ্রতি বাড়তে শুরু করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব রক্ষাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় আগের চেয়ে বেশি অনীহা দেখা গেছে। মাস্ক ছাড়াই বাজারে ঘোরাফেরা করছেন অনেকে। বিক্রেতাদের মধ্যেও রয়েছে মাস্ক না পরার প্রবণতা। শহরের অলিগলিতে কোন স্বাস্থ্যবিধি মানার বলাই নেই। সংক্রমণ রোধে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার নির্দেশনা থাকলেও তা কার্যকরে সরকারি কোনও উদ্যোগও নেই মাঠ পর্যায়ে। বিধিনিষেধ শুধু কাগজে- কলমেই।


সমপ্রতি আইইডিসিআর’র পরিচালিত জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ৮০ শতাংশই ভারতীয় (ডেল্টা) ভ্যারিয়েন্ট। গত ১৬ই মে বাংলাদেশে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিতের পর থেকে আইইডিসিআর ও আইদেশী এ পর্যন্ত ৫০টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করেছে। এসব নমুনার মধ্যে ৪০টি (৮০ শতাংশ) নমুনায় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট, ৮টি (১৬ শতাংশ) নমুনায় বিটা ভ্যারিয়েন্ট (সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট) শনাক্ত হয়েছে। মিলেছে একটি অজানা ভ্যারিয়েন্টেরও। আইইডিসিআর’র পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, সতর্কতা এখন আরও বাড়ানো দরকার। যে কোনো ভ্যারিয়েন্টের থেকে এটার ছড়ানোর ক্ষমতা কিন্তু বেশি। সেক্ষেত্রে সাবধানতাটা আমাদের আরও বেশি পালন করতে হবে। যেখানে কিন্তু আমরা কোনো রকমের সচেতনতা কারো মধ্যে দেখছি না সেইভাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভ্যারিয়েন্টটিকে ‘উদ্বেগের ভ্যারিয়েন্ট’- বলে অভিহিত করেছে।

সংক্রমণের এই পর্যায়ে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, কার্যকর বিধিনিষেধ, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার সঙ্গে গণহারে টিকা দিতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হার্ড ইমিউনিটির জন্য অন্তত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে। ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক মনে করেন, টিকা জোগাড় করাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যদি ধরে নেই যে ৭০ শতাংশ লোককে আমরা টিকা দেবো তাহলে এখন বাংলাদেশকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ২৫ কোটি ডোজ টিকা জোগাড় করতে হবে। তিনি বলেন, ২৫ কোটি ডোজ পাওয়া সহজ কথা নয়। আবার যদি বুস্টার ডোজ লাগে তাহলে আরো সাড়ে ১২ কোটি ডোজ লাগবে। তার মানে আমাদের ৪০ কোটি ডোজ টিকার একটা মজুত রাখতে হবে বা সম্ভাবনা রাখতে হবে। এইটা তখনই সম্ভব যখন আমরা নিজে টিকা তৈরি করতে পারবো। বাংলাদেশেরও উচিত হবে বেশ কয়েকটা সোর্স থেকে টিকা আমদানি করা।


পাশাপাশি টেকনোলজি ট্রান্সফারের মাধ্যমে কোনো টিকা আমাদের দেশে তৈরি করা যায় কিনা-সে সম্ভাবনা দেখে তা বাস্তবে রূপ দেয়ার চিন্তা করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নাই।
জনস্বাস্থ্যবিদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য কমিটির সদস্য এ বিষয়ে
বলেন, ঢাকার বাইরে যেভাবে সংক্রমণ বেড়েছিল ঠিক একইভাবে ঢাকায়ও সংক্রমণ বাড়ছে। আমরা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছি। কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। আমি আশঙ্কা করছি যে, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে ঢাকা শহরে ভাইরাসের সংক্রমণ খুলনা বা রাজশাহীর মতোই খারাপ হয়ে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম দেশে জুলাইয়ের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে করোনার তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে। এখন সংক্রমণের গতি দেখে মনে হচ্ছে জুলাইতে যাওয়ার আগেই তৃতীয় ঢেউ ঘটে যাবে। এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, কোভিড পরীক্ষা বাড়ানো ও সংক্রমিত ব্যক্তিদের অন্যদের থেকে আলাদা করার ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে মনে হয়। সবাইকে সম্পৃক্ত করে কাজ করতে হবে। তাহলে চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার মতো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভাব হবে।


র‌্যাপিড টেস্ট বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী মানবজমিনকে বলেন, দেশে করোনার সংক্রমণ সত্যিই আবার বাড়ায় শঙ্কিত। সেটা ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট হোক বা অন্য কোনো ভ্যারিয়েন্ট হোক। মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার অবহেলায় সংক্রমণ বাড়ছে। সীমান্তে করোনার সংক্রমণকে যথাসময়ে প্রতিরোধ করা যায়নি। করোনা সংক্রমণ আরও বাড়লে সামাল দেয়া কঠিন হবে। তিনি বলেন, করোনার নমুনা যে পরিমাণে টেস্ট হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। যে পরিমাণে টেস্ট করানো হচ্ছে তাতে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে উপসর্গ নিয়ে অনেককে এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করছেন। নমুনা পরীক্ষা আরও বাড়াতে হবে। এই জনস্বাস্থ্যবিদ মনে করেন জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে সম্পৃক্ত করতে। শুধু প্রশাসন দিয়ে হবে না।


এদিকে, গতকাল মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, উত্তরবঙ্গের হাসপাতালগুলো করোনা রোগীতে ভরে গেছে। রোগীদের সামাল দেয়া কঠিন হচ্ছে। আমরা চাই না ঢাকা ও দেশের অন্যান্য জেলায় এই সমস্যা দেখা দিক। তিনি বলেন, ভারতের ডেল্টা ধরন আমাদের দেশে চলে এসেছে। ডেল্টা ধরনের সংক্রমণ ক্ষমতা ৫০ শতাংশের বেশি রয়েছে। কাজেই এই সময়টা আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, রংপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, নওগাঁ এসব জেলায় করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো কোনো জেলায় করোনা সংক্রমণ হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হয়ে গেছে। এদিকে নোয়াখালী ও রাজবাড়ীতেও করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। মন্ত্রী বলেন, দেশে পুনরায় টিকাপ্রদান কর্মসূচি চালু করতে পারিনি। চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে টিকা পাব এবং চুক্তি অনুযায়ী ভারতে কাছ থেকেও টিকা পাবো। আমারা আশা করছি খুব শিগগির টিকা পেয়ে যাবো। টিকা নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একজন মানুষ করোনা থেকে সুরক্ষা হয় না। তারও এক মাস সময় লাগে।




বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top