বিভিন্ন সমস্যায় নিমজ্জিত আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান

ধামইরহাট (নওগাঁ) প্রতিনিধি: | প্রকাশিত: ২৩ মে ২০২৬ ২১:০২; আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ২৩:২৫

- ছবি - ইন্টারনেট

উত্তর জনপদের জেলা নওগাঁ সাহিত্য,সংস্কৃতি,ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মোড়ল খ্যাতি পেয়েছে অনেক আগেই। এই জেলাতে এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার (সোমপুর বিহার), কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত বিবরদিঘী,ঐতিহাসিক মাহি সন্তোষ মাজার, দুবলহাটি রাজবাড়ী,পতিসর রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি সহ আরও অনেক উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে।

এর মধ্যে বর্তমান সময়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান।

জেলা শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত ধামইরহাট উপজেলাধীন সীমান্ত কোলঘেষা এই উদ্যান এখন উত্তর জনপদের প্রকৃতিপ্রেমি পর্যটকদের প্রথম পছন্দ হিসাবে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। বিশাল বিশাল শালগাছ আর বেত বাগানের মিশেলের এই উদ্যানকে ভিন্নমাত্রা যোগ দিয়েছে উদ্যানের বুকে থাকা ৪৩ একর আয়তনের বিশার এক দিঘি, যার নাম আলতাদিঘী।

আর এই কারণেই নামকরণ করা হয় উদ্যানের। সারাবছর জুড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসে প্রকৃতি প্রেমি পর্যটকরা। বিশেষ করে ঈদ এবং সরকারি ছুটির দিনগুলো পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড় দেখা যায়।

তবে উদ্বেগের বিষয় হল বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে নানাবিদ সমস্যা ঘিরে ধরেছে আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যানকে। প্রথম সমস্যা উপজেলা শহর থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত উদ্যানে প্রবেশের এই রাস্তাটি অত্যন্ত সরু। মোটরসাইকেল,প্রাইভেট কার কিংবা মাইক্রোবাস স্বাভাবিক চলাচল করতে পারলেও যাত্রীবাহী বাস উদ্যানে প্রবেশ করতে গেলে রীতিমতো বেগ পোহাতে হয়।

অনেক সময় দেখা যায় উদ্যানে প্রবেশ করতে না পেরে যাত্রীবাহী বাস থেকে পর্যটকরা নেমে পায়ে হেঁটে প্রবেশ করে উদ্যানে। এতে সময় আর দুর্ভোগ দুটোকে মোকাবেলা করতে হয় পর্যটকদের। আর বিশেষ বিশেষ ছুটির দিনগুলোতে এই রাস্তায় যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে গাড়ির চাপে। এলাকাবাসী এবং পর্যটকরা দীর্ঘদিন থেকে দাবি করে আসছে এই রাস্তাটি প্রশস্তকরণের জন্য। যাতে করে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে স্থানীয় গ্রামবাসী এবং পর্যটকদের বহনকারী যানবাহন।

উদ্যানের মূল আকর্ষণ গুলোর মধ্যে অন্যতম স্থান ওয়াচ টাওয়ার। যেটি উদ্যানের মূল স্পটে দিঘীর পাশে নির্মিত। ইদানিং লক্ষ্য করা গেছে ওয়াচ টাওয়ারের এস এস পাইপের গার্ড রেলিং অনেক জায়গায় ভেঙে গিয়েছে কিংবা চুরি হয়ে গিয়েছে। সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার হলো গার্ড রিলিং ভাঙ্গা।

প্রায় ৭০ ফুট উঁচু এই ওয়াচ টাওয়ারটিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক উঠে উপর থেকে উদ্যানের সৌন্দর্য উপভোগ করে। কিন্তু ভাঙ্গা গার্ড রেলিং এর কারণে ওয়াচ টাওয়ারটির অনেক অংশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য অসতর্কতা এনে দিতে পারে বড় ধরনের দূর্ঘটনা।

গত কয়েক বছর আগে এই উদ্যান সংস্কারের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। যার ফলে দিঘির চারপাশে থাকা বেশকিছু পুরনো গাছ কাটা সহ দিঘী খনন করে পার বাঁধাই করা হয়। সংস্কারের পর থেকেই দিঘীটি আর কখনো জলাধারে পরিণত হয়নি। ৪৩ একর আয়তনের এই দিঘীটি বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময় প্রায় শুকনো থাকে। যেটি উদ্যানের সৌন্দর্যহানীর একটি অন্যতম কারণ। এ নিয়ে সুধি মহলে বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

পরবর্তীতে নতুন করে কিছু গাছ রোপন করা হলেও সেখানে অবাধে গরু ছাগল চলাচলের কারনে নতুন গাছগুলো স্বাভাবিক বর্ধনে সেটিও এখন হুমকির মুখে। বলা যায় দিঘীর পশ্চিম প্রান্ত এখন গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি গরু-ছাগলের বিষ্ঠা পর্যটকদের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি উদ্যানের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট এবং সৌন্দর্য হানি করছে।

গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টির কারণে দিঘির চারপাশ দিয়ে পর্যটকদের চলাচলের জন্য নির্মিত রাস্তা এবং দিঘীর পাড়ের বেশ কিছু অংশ ভেঙে গেছে। সরেজমিনে দেখা যায় প্রায় ৫ থেকে ৬ টি স্থানে বড় ধরনের গর্ত দেখা দিয়েছে। দিঘির চারপাশে এসব গর্ত পর্যটকদের চলাচলের জন্য এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। এছাড়াও দিঘির চারপাশে চারপাশে ঢালাইকৃত যে রাস্তা আছে সেটিও কিছু অংশ বেশ ঝুকিপূর্ণ। দ্রুত সেগুলো সংস্কার না করা হলে আগামীতে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে আলতাদিঘী।

এই বিষয়ে অত্র উপজেলার সন্তান পরিবেশ কর্মী বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)র সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন বিগত সরকারের আমলে উদ্যান সংস্কার করা হলেও পরবর্তীতে এই কাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এরফলে এই বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে জাতীয় উদ্যানটিকে।

উদ্যানে থাকা ৪৩ একর আয়তনের দিঘীটি খননের পর পানির স্থায়িত্ব না থাকাটা বেশ উদ্বেগের। জলধারটিতে কেন পানির স্থায়িত্ব হয়না তা ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তোলেন তিনি। পাশাপাশি পর্যটন পূর্ণ এই এলাকার উল্লেখযোগ্য স্থান আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যানকে যথাযোগ্য ভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন বিভাগ কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আহবান জানান।

ধামইরহাট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুর রউফ বলেন আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যানে অত্র এলাকার পর্যটন খাতের সম্পদ। এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায় সবার। আমাদের সচেতনতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ধামইরহাট মানসেবা সংগঠনের সভাপতি রাসেল হোসেন বলেন আগামী ঈদের ছুটিতে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী আসে এই উদ্যানটিতে। তারা যাতে করে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে জন্য ক্ষতিগ্রস্ত কাঠামো গুলো দ্রুত মেরামতে প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন

এই বিষয়ে বণ–বিট রেঞ্জ কর্মকর্তা ফরহাদ জাহান বলেন বিষয়গুলো সমন্ধে তিনি অবগত আছেন। তিনি বলেন লোকবল কম থাকার কারণে এসব দমন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন বিষয় দেখা হবে কিভাবে এগুলোর সমাধান করা যায়। পাশাপাশি জাতীয় উদ্যানের সৌন্দর্য এবং সম্পদ রক্ষার্থে জনসাধারণকেও সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।



বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top