প্রসবে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার রোধে হাইকোর্টের রুলের রায় আজ

রাজ টাইমস | প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০২৩ ০৯:০৮; আপডেট: ২৯ মে ২০২৪ ০২:৫০

ছবি: প্রতীকী

সরকারি-বেসরকারি ক্লিনিকে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশন প্রতিরোধে কার্যকর তদারকি করতে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে জারি করা রুলের ওপর শুনানি শেষ করা হয়েছে। এ বিষয়ে রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন ঠিক করেছেন হাইকোর্ট।

বৃহস্পতিবার (১২ অক্টোবর) হাইকোর্টের বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ বিষয়ে রায় ঘোষণা করবেন।

রিটকারী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, অপ্রয়োজনীয় সিজার কার্যক্রম বন্ধে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়েছে। আজ হাইকোর্ট এ বিষয়ে রায় ঘোষণা করবেন।

এর আগে ২০১৯ সালের ৩০ জুন সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার (সিজারিয়ান) রোধে একটি নীতিমালা তৈরিতে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

এ সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মোহাম্মদ আশরাফুল কাামলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

এক মাসের মধ্যে ওই কমিটি গঠনে করে কমিটিকে ৬ মাসের মধ্যে নীতিমালা তৈরি করে আদালতে দাখিলের নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। পরবর্তীতে ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর এ বিষয়ে শুনানির জন্যে রাখেন।

সেই সঙ্গে রুল জারি করেছেন আদালত। রুলে সরকারি-বেসরকারি ক্লিনিকে মেডিক্যালি অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশন প্রতিরোধে কার্যকর তদারকি করতে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। চার সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতিকে রুলের জবাব দিতে হবে।

হাইকোর্ট আদেশে বলেন, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান রোধে আগামী ৬ মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে একটি কমিটি করে ওই কমিটির মাধ্যমে একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

আদালতে ওইদিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী আয়েশা আক্তার। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পূরবী রানী সাহা ও পূরবী রানী শরমা। তারই ধারাবাহিকতায় সেটি শুনানি করা হয়েছে।

এর আগে সকালে প্রসূতির সিজারের বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের পক্ষে তাদের আইন উপদেষ্টা এসএম রেজাউল করিম এ রিট করেন। আদালতে এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য ৫ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন।

ওইদিন রাশনা ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে একটি আদেশ দিয়েছেন। তারা সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিটি করবেন এক মাসের মধ্যে। ছয় মাসের মধ্যে একটি নীতিমালা কোর্টে দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। নীতিমালার মূল বিষয় হবে যে মেডিক্যালি অপ্রয়োজনীয় যে সিজারিয়ান সেকশনগুলো হচ্ছে-এটার হার যে বৃদ্ধি হয়ে যাচ্ছে সেটা কমানোর।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মতে শতকরা ১০ থেকে ১৫ ভাগের বেশি সি-সেকশন কোনো দেশেরই প্রয়োজনীয় হতে পারে না। বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে এটা প্রায় ৩১ শতাংশ। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ৮৩ শতাংশ এবং সরকারি হাসপাতালে এটার হার ৩৫ শতাংশ। এনজিও হাসপাতালগুলোতে ৩৯ ভাগ। এই যে একটা এলার্মিং রাইজ, রেটটা যে বৃদ্ধি পাচ্ছে এটাকে থামানোর জন্য এ মামলা।’

আদালতে চীন এবং ব্রাজিলের উদাহরণ তুলে ধরেছি উল্লেখ করে রাশনা ইমাম বলেন, ‘চীনে সি-সেকশনের হার বিশ্বের মধ্যে খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে নুতন রুলস রেগুলেশন প্রণয়নের কারণে এটা কমছে। ব্রাজিলেও একই জিনিস দেখতে পেলাম।’

তিনি বলেন, ‘গ্রাম-গঞ্জে যে বেসরকারি হাসপাতাল আছে সেগুলো কোনো ধরনের সরকারি মনিটরিং ছাড়া চালিয়ে যাচ্ছে। সি-সেকশন করে যাচ্ছে। এটা থেকে অনেকের অমানবিক মৃত্যুও ঘটেছে।’

একই বছরের ২০১৯ সালের ২১ জুন বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’বলছে বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশু জন্মের ক্ষেত্রে সিজারিয়ানের হার বেড়েছে ৫১ শতাংশ। বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার উল্লেখ করে সংস্থাটি বলছে, এতে বাবা-মায়েদের সন্তান জন্মদানে ব্যাপক পরিমাণে খরচের ভার বহন করতে হচ্ছে।

সিজারিয়ানের কয়েকটি ঝুঁকি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশু জন্মে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ফলে ইনফেকশন ও মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অঙ্গহানি, জমাট রক্ত ইত্যাদির কারণে মায়েদের সুস্থতা ফিরে পেতে প্রাকৃতিক প্রসবের তুলনায় দীর্ঘ সময় লাগে। এছাড়া সিজারিয়ানের কারণে প্রাকৃতিক জন্মের লাভজনক দিকগুলোও নষ্ট হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশি বাবা-মায়েরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানে খরচ করেছেন প্রায় চার কোটি টাকার বেশি। জনপ্রতি গড়ে তা ছিল ৫১ হাজার টাকার বেশি। সিজারিয়ানে সন্তান জন্মদানের হার বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মারাত্মক হারে বেশি। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যত শিশু জন্ম নেয় তার ৮০ শতাংশই হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

সংস্থাটি আরও বলছে, ২০১৮ সালে যত সিজারিয়ান হয়েছে তার ৭৭ শতাংশই চিকিৎসাগতভাবে অপ্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু তারপরও এমন সিজারিয়ান হচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ২০০৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রসবকালীন অস্ত্রোপচার ৪ থেকে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেন এমন অপ্রয়োজনীয়ে প্রসবকালীন অস্ত্রোপচার ঠেকাতে ডাক্তারদের ওপর নজরদারির পরামর্শ দেয়। এমন প্রবণতার জন্য সংস্থাটি আংশিকভাবে বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবাখাতের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছে।



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top