নবাবগঞ্জে দ্বিমুখী লড়াইয়ে কোণঠাসা বিএনপি
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের অবস্থান ॥ লুটকৃত অস্ত্র নিয়ে শঙ্কা
শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:২৮; আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:২৭
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কাগজে-কলমে বহু দলের অংশগ্রহণ থাকলেও বাস্তবতায় তিনটি আসনেই নির্বাচন রূপ নিয়েছে ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার ভোটযুদ্ধে। ভোটারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন ন্যায় দুর্নীতিমুক্ত গঠন মূলক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিকে। এদিকে ক্ষমতা ধরে রাখার দ্বিমুখী লড়াইয়ে তিনটি আসনেই অনেকটা কোনঠাসা অবস্থায় রয়েছে বিএনপি। পাশাপাশি ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ৫০টি পিস্তলসহ বিপুল পরিমাণ লুটকৃত গোলাবারুদ নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ত্রয়োদশ নির্বাচনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি নয়; বরং সংগঠন, আদর্শ ও ‘ভোট ব্যাংক’ নিয়ন্ত্রণের লড়াই। তিনটি আসনেই জয়-পরাজয়ের ফয়সালা নির্ভর করছে চারটি ফ্যাক্টরের ওপর। এর মধ্যে দলীয় ভোট, আওয়ামী লীগের নীরব ভোট, সংখ্যালঘু ভোট এবং নতুন ও ভাসমান ভোটারদের উপর। পাশাপাশি বিএনপির সাবেক এমপিদের দুর্নীতিতে সাজা হবার ঘটনাও আলোচনায় আসছে। তিনটি আসনের বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং পৌরসভার ভোটার জানান, আসনগুলোতে জামায়াতে ইসলামী অনেক আগেই তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচারণার কাজ এগিয়ে রেখেছে। অপর দিকে বিএনপির একাধিক প্রার্থী না থাকলেও প্রার্থীতা নিয়ে স্থানীয় দলের মধ্যে যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে। মনোনয়ন বঞ্চিতরা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। দিন যতই যাচ্ছে তাদের মধ্যে দূরত্ব ততই বাড়ে চলেছে। এবারের নির্বাচনে ভোটাররা ব্যক্তির চেয়ে জুলাই চেতনা ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ): অভিজ্ঞতা বনাম ‘নতুন প্রত্যাশা’
শিবগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১। এই আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ১’শ৮১ জন। নারী দু’লাখ ৪৪ হাজার ৮৬৫ এবং পুরুষ দু’লাখ ৫৫ হাজার ৩১৬। এর মধ্যে তরুণ ভোটার ৭ হাজার ৬’শ দুই জন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছয় প্রার্থী। এর মধ্যে সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট থেকে মো. আব্দুল হালিম, ইসলামী ফ্রন্ট নবাব মো. শামসুল হোদা, জাতীয় পার্টি থেকে মোহা. আফজাল হোসেন ও ইসলামী আন্দোলনের মো. মনিরুল ইসলাম ভোটের লড়াইয়ে আছেন। এখানে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই। তবে মাঠের বাস্তবতায় মূল লড়াই বিএনপির সাবেক হুইপ এবং সাবেক এমপি অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রাজশাহী মহানগরীর আমীর ড. মাওলানা কেরামত আলীর মধ্যে। সাবেক এমপি শাহজাহান মিয়া এই আসনে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি, সংখ্যালঘু ভোট এবং আওয়ামীলীগের একটি অংশের নীরব সমর্থন পাবেন বলে স্থানীয়রে একটি পক্ষ মনে করছেন। অপর দিকে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী ড. কেরামত আলী দুইবারের সাবেক সফল উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও পরিচ্ছন্ন ইমেজকে পুঁজি করে মাঠে কাজ করছেন। স্থানীয়ভাবে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি “নতুন মুখ ও কার্যকর নেতৃত্বের” প্রত্যাশী ভোটারদের বড় একটি অংশ তার দিকে ঝুঁকেন। এআসনের বিভিন্ন ইউনিয়নে কথা বলে জানা গেছে, ভোটাররা এবার নতুন মুখ দেখতে চাচ্ছেন। এর আগে শাহজাহান মিয়া চারবার বিজয়ী হলেও তিনি এলাকার দৃশ্যমান উন্নয়ন করেনি। এমনকি সোনামসজিদ স্থলবন্দরকে কাস্টমস হাউজে রুপান্তর করতে কোন ভূমিকা রাখেননি। এলাকায় তার উল্লেখযোগ্য দৃশ্যমান কোন কাজ নেই। এছাড়া তিনি বয়সের ভারে এক রকম নূয্যমান। ফলে এবার ভোটাররা আশায় বুক বেঁধেছেন যোগ্যপ্রার্থী হিসেবে সাবেক জনপ্রিয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও জামায়াতের ড. কেরামত আলীকে ভোট দেয়ার জন্য। তিনি দলীয় ব্যনারের বাইরে বিশেষ করে খেটে খাওয়া তৃণমূল ও মধ্যবিত্ত পর্যায়ের জনসাধারণ এবং সেই পরিবার গুলো সমর্থন পাচ্ছেন তিনি। জনসাধাণের হিসেবে নিকেশে ড. কেরামত আলী বিএনপি প্রার্থীর চাইতে বহু গুনে এগিয়ে আছেন। এবারের নির্বাচনে এ আসনে ১৫৯টি কেন্দ্রের মাধ্যমে ৯৩৬টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (নাচোল-গোমস্তাপুর-ভোলাহাট): বিএনপির ঘাঁটি, সুযোগ নেই আত্মতুষ্টির
নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন। তথ্যানুযায়ী, মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ দু’লাখ ২৫ হাজার ১৯ ও নারী ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ২৩৭। এখানে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির মু. খুরশিদ আলম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি মো. সাদেকুল ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলনের মো. ইব্রাহিম খলিল। তবে ধানের শীষ প্রতীক বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি মো. আমিনুল ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মু.মিজানুর রহমানের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে। উভয় দল সাংগঠনিক শক্তির উপর ভিত্তি করে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। ২০১৮ সালে এই আসনে বিএনপি সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দেয়। তবে এবার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াতের ড. মিজানুর রহমানকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষিত, ভদ্র ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় এই প্রার্থী মাঠে নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। জামায়াতের ভোটব্যাংক, ভাসমান ভোট এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষএই তিনটি উপাদান এখানে জামায়াতের আশার জায়গা।
স্থানীয়রা জানায়, রহনপুরে রেলবন্দর আছে। কিন্তু কোন আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তারা এ অঞ্চলের উন্নয়নে তেমন গুরুত্বের সাথে কিছু দেখেননি। বরং প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের কাছে ভোট নিয়ে কাজের কাজ করেননি। এবার ভোটাররা প্রত্যাশা করছেন যিনি বাস্তবে উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন তাকেই ভোট দিবেন। এ বিবেচনায় তারা সৎ ও যোগ্য প্রার্থী হিসেবে জামায়াতকে বেছে নিতে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিমত পাওয়া গেছে। নাচোল এক আদিবাসী বলেন, “নির্বাচনে আদিবাসীরা কিছুই চায় না; শান্তিতে থাকতে চায়। যেই দলই জিতুক সরকারি পুকুর দখল, জমি দখল, হানাহানি চাই না। রাতে আরামে যেন ঘুমাতে পারি।” রিপন আলী নামের অপর এক ভোটার বলেন,“ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে। কিন্তু দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সুযোগ পাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। আরেক ভোটার বলেন, “বড়গাছি জামবাড়িয়া ও চৌডলা এলাকায় জাতীয় পার্টি কিছু ভোট পাবে। তবে এ আসনের মূল লড়াই হবে বিএনপি আমিনুল ইসলামের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর মিজানুর রহমানের।” আওয়ামী লীগ না থাকায় উত্তেজনা তুলনামূলক কম হলেও শেষ মুহূর্তে ভাসমান ভোট জামায়াতের পক্ষে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে স্থানীয় বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই সাবেক এমপি মো. আমিনুল ইসলামকে বয়কটের ডাক দেয় এই আসনের মনোনয়নবঞ্চিত তিনজন প্রার্থী। তাদের অন্যতম অভিযোগ ছিলো, তিনি ২০১৮ সালের ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে যান এবং আওয়ামী লীগের সাথে ‘আতাতের মাধ্যমে’ নিজের আখের গুছান। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপির বড় একটি অংশ নিশ্চুপ রয়েছেন। যার পুরো সুযোগ পাবেন জামায়াত প্রার্থী ড. মিজানুর রহমান। এই আসনের ১৮৪টি কেন্দ্রের ৮৭৭টি কক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর): লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি
জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত আসন সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬২ হাজার ৭৩৪। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দু’লাখ ৩৩ হাজার ২১৭ জন ও নারী ভোটার দু’লাখ ২৯ হাজার ৫১৭। এখানে ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের শক্ত অবস্থান থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে আসনটি বিএনপির দখলে। লতিফুর রহমান এখান থেকে ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে বিজয়ী হন। নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সালে বিএনপি, আ’লীগের সঙ্গে লড়ে জামায়াত নেতা লতিফুর রহমান এককভাবে ৭২ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় হন আর বিএনপির হারুনুর রশিদ ৭৬ হাজার ভোট নিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। আর জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনেও হারুনুর রশিদ বিএনপির টিকেটে সাড়ে ৮৫ হাজার ভোট নিয়ে জয় পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লতিফুর রহমান ৬০ হাজারের অধিক ভোট নিয়ে দ্বিতীয় হন। সেবার আ’লীগ তৃতীয় হন। ভোটারদের অভিমত, এখানে দু’দলের শক্তি হচ্ছে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা। সমানে সমানে দল দুটি পাল্লা দিতে পারে। দুটি দলের ভোটের ব্যবধানও অল্প। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এবং নতুন ভোটারও বড় একটা ফ্যাক্টর। এই আসনে এবার বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি হারুন-আর-রশীদের সঙ্গে জামায়াত প্রার্থী ঢাকা দক্ষিণের আমির ও সাবেক শিবির নেতা নুরুল ইসলাম বুলবুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে হাড্ডাহাড্ডি। সুষ্ঠু ভোট হলে যে কেউ জিততে পারে। তবে এই দুই ‘ভোট ব্যাংক’ যার ঝুলিতে নিতে পারেবন তাদের দিকেই জয়ের পাল্লা ভারী হবে। এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি’র মো. ফজলুর ইসলাম খাঁন, গণঅধিকার পরিষদের মো. শফিকুল ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের মো. মনিরুল ইসলাম। স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে দেখা গেছে, “এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রার্থী পদ্মা নদীর ভাঙ্গন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস এবং চরাঞ্চলের উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। তবে দিয়াড় অঞ্চলে বিএনপির ‘ভোট দুর্গে’ এবার রীতিমতো ভাগ বসিয়েছে জামায়াত।” এ আসনেও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া ও সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম ওরফে চায়নিজ রফিকে সাথে দলীয় দুরত্ব রয়েছে। এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে বিএনপি প্রার্থী হারুণের দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত ও তার সাবেক আপন চাচাতো ভাই আ’লীগের সাবেক এমপি আব্দুল ওদুদের প্রায় ২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও ১৮০ কোটি টাকার বেশি সন্দেহভাজন লেনদেনের তথ্য। এসব অনিয়ম ও দুর্ণীতি ভোটারদের মনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলছে। তারা দুই ভাই একাধীক টার্মে এমপি থাকলেও চাঁপাই নবাবগঞ্জের উল্লেখযোগ্য কোন উন্নয়ন না করলেও ব্যক্তিপর্যায়ে অভাবনীয় উন্নয়ন করেছেন। চাচাতো ভাই আব্দুল ওদুদ দুর্নীতির টাকায় ঢাকা, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে নামে বেনামে কিনেছেন কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ৫-৭টি বাড়ি। স্থানীয় বাজারে রয়েছে বহুতল ভবন বিশিষ্ট কয়েকটি মার্কেট ও ৭০ বিঘা জমির ওপর একটি খামারবাড়ি। হলফনামা বিবরণীতে দেখা যায়, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ১৫ বছরে ওদুদের সম্পদ বেড়েছে শত গুণের বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও ঢাকাতে জমি, মার্কেট, অ্যাপার্টমেন্ট ও বাড়ির ছড়াছড়ি। আর শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে করা মামলায় বিএনপি প্রার্থী হারুন-অর রশিদকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ছয় মাসের দণ্ড দেয় আদালত। পরে উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকে। আর দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ায় হারনের সংসদ সদস্য পদ খারিজ হয়ে।
এই আসনে ভোটাররা চাচ্ছেন যিনি কথায় নয়, বাস্তবে কাজ করবেন তাকেই তারা ভোট দিবেন। এর মধ্যে রয়েছে, নয়াগোলা হয়ে সোনামসজিদ পর্যন্ত বিকল্প মহাসড়ক নির্মাণ, রেলের আধুনিকায়ন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ স্থলবন্দর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ, কৃষিভিত্তিক অর্থনেতিক জোন স্থাপন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরকে আধুনিক শহরে পরিণত করা, গ্রামীণ জনপদের রাস্তার উন্নয়ন ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান। এছাড়া, মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল এবং পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে মুখ্য ভূমিকা যিনি রাখতে পারবেন বলে ভোটাররা তার কাছে আশাবাদি। জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আবুজার গিফারী বলেন, “তিনটি আসনেই জামায়াতের বিজয়ের সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছি। নির্বাচনি প্রচার তৎপরতা চলছে আমাদের। এখন পর্যন্ত নির্বাচনি পরিবেশে বড় কোনো সমস্যা হয়নি। তবে সরকার, প্রশাসনের লোকজনের ধানের শীষের প্রতি একটা টান লক্ষ্য করছি। “তিনটি আসনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও উন্নয়নের জন্য নানামুখী পরিকল্পনার কথা ইস্তেহারে আমরা তুলে ধরেছি। যুবকদের কর্মসংস্থান, নারীদের সুযোগ-সুবিধাসহ মানুষের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে মানুষের আগ্রহ বেশি।” চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসন ঘুরে দেখা গেছে এবার নির্বাচন হচ্ছে বিএনপির জন্য আসন ধরে রাখার পরীক্ষা, জামায়াতের জন্য হারানো আসন পুনরুদ্ধারের সুযোগ। কোনো আসনেই ফলাফল একপেশে নয়। শেষ মুহূর্তের ভোট গণিত, কেন্দ্রভিত্তিক উপস্থিতি ও নীরব ভোটের দিকনির্দেশই নির্ধারণ করবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কার দিকে যাবে। তবে ভোটারা মন্তব্য করছেন বিএনপি প্রার্থী মাঠে যথেষ্ট কোনঠাসা অবস্থায় রয়েছেন। এ আসনে ১৭২টি ভোটকেন্দ্রের ৯২৮টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে।
এদিকে নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসায় তিনটি সংসদীয় আসনে ভোটের মাঠে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র। সাধারণ ভোটাররা বলছেন, জেলার সরকারি মালখানা থেকে খোয়া যাওয়া অস্ত্র দীর্ঘ সময়েও উদ্ধার না হওয়ায় জনমনে এ শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যে কোন মুহুর্তে এই অবৈধ অস্ত্র সহিংসতার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। পুলিশের দায়ের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দিন উদ্ভূত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একদল দুর্বৃত্ত সুপরিকল্পিতভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সরকারি মালখানায় হামলা চালায়। তারা মেইন গেট ও গোডাউনের তালা এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে প্রায় ৫০টি পিস্তল, ১০০টি ম্যাগাজিন, ২৫০ রাউন্ড গুলি এবং ২০টি ওয়ান শুটার গানসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায়। পুলিশের নথি অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রসহ সেদিন সরকারি মালখানা থেকে প্রায় ৬০ কোটি টাকার সম্পদ লুট হয়।
এদিকে সরকারি মালখানা লুটের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটির তদন্তে ‘ঢিমেতাল’ গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধিবাসিরা। তাদেও অভিযোগ “এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্ত কার্যক্রমে কোনো অগ্রগতি নেই; তদন্তে গাফিলতি রয়েছে। অস্ত্র লুট হওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে কয়েকজনকে আটক করা হলেও তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে। লুট হওয়া এসব অস্ত্র দীর্ঘদিনেও উদ্ধার না হওয়ায় এখন সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।’ মামলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাগেছে, “লুটের মামলায় এখন পর্যন্ত দুটো মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। কোনো আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই মামলায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তারা এখন জামিনে আছেন।” অপর দিকে ভোটারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত ছিল ভোটের আগেই বিশেষ অভিযান চালিয়ে অন্তত কিছু অস্ত্র উদ্ধার করে আমাদের আশ্বস্ত করা।” অথচ পুলিশ এবিষয়ে পুরোপুরি ব্যর্থ। এদিকে বিএনপির দলীয় কোন্দলের জের ধরে একাধীক গ্রুপের মধ্যে বোমাবাজী ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সেখানে লুণ্ঠিত অস্ত্র দিয়ে বড় কোন অঘটন ঘটবেনা এটা নিশ্চিত ভাবে বলা যাবেনা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: