মজাদার ছড়াগ্রন্থ ‘ জ্বীন পরী আর ভূতো ’

রাসেল খান | প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২১ ২১:৫১; আপডেট: ১৩ জুন ২০২১ ২১:৫৩

বাংলা সাহিত্যে সুপরিচিত মুখ মাহফুজুর রহমান আখন্দ। যিনি একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত ছড়াকার, কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার-সুরকার, গবেষক, সাহিত্য সমালোচক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ রয়েছে। তিনি তাঁর লেখনীর শক্তির জোরে ছোট বড় সকল পাঠকের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন।

তিনি যেমন লেখেন বড়দের জন্য তেমনি লেখেন কোমলমতি ছোট্ট শিশুদের জন্য। এছাড়া বড়দের জন্য লেখা যতটা সহজ ছোটদের জন্য ততোটা সহজ বলে আমি মনে করি না। আর সেই কঠিন কাজটাই তিনি করছেন পরম ভালোবাসায়। এককথায় শিশুদের জন্য লিখতে হলে মনের ভেতর একটি শিশুদের জগত তৈরি করতে হয়। শিশুদের চোখ দিয়েই দেখতে হয় সেই জগতটাকে। আর তেমনি একটি জগৎ ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দ তৈরি করেছেন তাঁর মনের ভেতর। তাঁর শিশুতোষ লেখা আলো ছড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। আলোকিত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। পাচ্ছে আলোর দিশা।

মেধা ও মননে বিকশিত হচ্ছে আগামীর প্রজন্ম। এর মধ্যে তিনি উপহার দিয়েছেন নানামুখী বই। দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যে। "জ্বীন পরী ও ভূতোং" ছড়াগ্রন্থের মধ্যে দিয়ে সমাজের বাস্তব চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। ছড়াগ্রন্থটিতে মোট ১৪ টি ছড়া রয়েছে। প্রতিটি ছড়াই জ্বীন পরী ও ভূতকে নিয়ে।

আমরা অনেকেই জ্বীন পরী ও ভূতের গল্প শুনলেই চমকে উঠি। আতঙ্কিত হই। গা ছম ছম করে। রাতেরবেলা একা চলতে পারি না। এছাড়া রাতে ভয়ে একা ঘরেও ঘুমোতে পারি না। ছোটরাও জ্বীন পরী ও ভূতের বই পড়তে পছন্দ করে। ছোটদের প্রিয় সব বইয়ের মধ্যে অন্যতম হলো ভূতের বই। ছড়াকার সমাজের অসঙ্গতিকে জ্বীন পরী ও ভূতের ছড়ার মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছেন। কারণ এ সমাজে মানুষরূপী ভূতেরও অভাব নেই। ভূতের বেশ ধরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে এ দেশটাকে। এরা ভূতের চেয়েও ভয়ংকর। এছাড়া মানুষরূপী ভূতের হাত রক্ষা পাওয়া বেশ কষ্ট সাধ্য ব্যাপার৷ তবুও দিনের পর দিন চেষ্টা চলছে এদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। ছড়াকার নিপুণ হাতে দক্ষতার সাথে ছোট বড় সবার জন্য পাঠ উপযোগী করে তুলেছেন বইটি।

বইটির প্রথম ছড়া 'জ্বীন পরীতে বিয়ে'র প্রথমাংশ এ রকম -

ইয়ে
আজকে হবে জ্বীন পরীতে বিয়ে

কনের বাড়ি
সাগর দাড়ি
বরের বাড়ি বাম্পানে
বরপক্ষ উড়াল দেবে
বরটা যাবে সাম্পানে।

চমৎকার তুলতুলে ছড়া। অসাধারণ শব্দচয়ন। ছন্দের দোলাতে রয়েছে অন্যরকম ভালো লাগা। বিশেষ করে শিশুরাও এমন ছড়া পড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে। ছোট ছোট বাক্যে হৃদয় ছোঁয়া লেখা। এছাড়া শব্দেও কোনো জটিলতা নেই।

'মেজাজ গরম জ্বীনের' ছড়াটির প্রথমাংশ -

বিয়ে বাড়ির উৎসবে
জ্বীন পরীরা আসলো সেজে
গোল পাকালো ভূতসবে

মণ্ডা মিঠাই ফলফলাদি
বিয়ে বাড়ির খাবার
ভূতের পার্টি বসলো এসে
করলো খেয়ে সাবার

শেষাংশ -

কাণ্ড দেখে ক্ষেপলো সবাই
মেজাজ গরম জ্বীনের
মনকে বলে সবর করো
অপেক্ষা সেই দিনের!

জ্বীনের বিয়ে বাড়িতে ভূতেরা এসে সব খাবার খেয়ে সাবার করে এবং চেয়ার টেবিলও ভেঙে ফেলে। কিন্তু কাউকে সামান্য ভয়ও করে না৷ এদিকে জ্বীনদের মেজাজ গরম হলেও ভূতদেরকে কিচ্ছু বলে না। শুধু মনকে সবর দিয়ে অপেক্ষায় রয় সেই দিনের জন্য। জ্বীনদের বিশ্বাস নিশ্চয়ই এমন এক দিন আসবে যে দিন ভুলের জন্য ভূতের শাস্তি পেতে হবে। এ ছড়াটিতে চমৎকার একটি বার্তা রয়েছে। যা আমাদের চলার পথে শিক্ষণীয়। তাই আমাদের উচিত কারো প্রতি সামান্যতমও অবিচার না করা। কারণ প্রতিটি ভুলের জন্য নিশ্চয়ই শাস্তি পেতে হবে। যে শাস্তি কোনো ভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়।

'জঙলি ভূতো' ছড়াংশ-

জঙলি বনের ভূতো
সন্ধে হতেই বাঁশবাগানে
রাখতো ঝুলে জুতো

দিনদুপুরে ভয় দেখাতে
ঝুল্লি দিতো গাছে
লোমমাখানো লম্বা দু'হাত
পাততো মাটির কাছে।

রাতের আঁধারে বাঁশবাগানে, বটগাছে কিংবা ঝোপঝাড়ে সাদা কাপড়, জুতো, ছেড়া জামা বা কোনো রশি ঝুলে থাকতে দেখলে আমাদের শরীর মুহূর্তের মধ্যে শিউরে উঠে। মনে হয় নিশ্চয়ই কোনো ভূতের কারসাজি। গা ছম ছম করে ওঠে। কখনো কখনো অই রাস্তা ছেড়ে বিকল্প রাস্তা দিয়ে হাঁটি৷ এখানে ঝরঝরে ও প্রাণবন্ত ছড়াটির মধ্যে দিয়ে চমৎকার চিত্রকল্প ফুটিয়ে তুলেছেন ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দ। এমন ঘটনা আজও আমাদের চারপাশে দেখা যাচ্ছে।

'জ্বীন বাবা' ছড়ার প্রথমাংশ-

হাত গণণা ফাতা ফুতা
তাবিজ কবজ খুলি
জ্বীনের নামে তেলেসমাতি
কারামতির বুলি

শেষাংশ -

জ্বীনপরীদের ব্যাগে ভরায়
পাঠায় তাদের বাড়িতে
দুষ্টুগুলো বন্দি রাখে
শিশি বোতল হাঁড়িতে

জ্বীন বাবাজি জ্বীন
আসল গুমর ফাঁস হলে ফের
ক্যামবে যাবে দিন!

আমাদের চারপাশে জ্বীন বাবার অভাব নেই। মিথ্যে বুলিতে আমাদের প্রতিদিন বোকা বানিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ-কড়ি। আমরাও বিশ্বাস করছি জ্বীন বাবাজির তেলেসমাতি। কিন্তু একবার যদি জ্বীন বাবার গুমর ফাঁস হয়ে যায়। তবে জীবনটারই শেষ রক্ষা হবে কিনা বলা মুশকিল। ছড়াটির মধ্যে দিয়ে ছড়াকার জ্বীন বাবাজিদের সতর্কতামূলক বার্তা দিয়েছেন। এজন্য এখনি সাবধান হও যত ভণ্ড জ্বীন বাবা।

'ভূত তাড়াতে জাইগ্যা ওঠো ' ছড়াতে -

ভূত বসেছে দেশের ঘাড়ে
পানির লাইন কারেন্ট তারে
অফিস পাড়ায় কোর্টের ঘরে
ভূত সারাদিন নড়েচড়ে।

রাজনীতিতে কাজনীতিতে
পড়ার ঘরেও নিত্য ভূতের ছানা
ভূতের ভয়ে সত্য কথা
বলতে নাকি মানা।

ছড়াটির মধ্যে দিয়ে সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছোট সময় দাদা দাদি ও বড়দের কাছে ভূতের গল্প শুনেছি। ভূতরা থাকে শ্যাওড়া গাছ, বট গাছ, গহীন বনের জঙ্গল, কবর নদী, খাল বিল ও ঝোপেঝাড়ে। গল্প শোনার পর ঝোপঝাড় কিংবা কবরের পাশ দিয়ে যেতে ভয়ে শরীর কেঁপে উঠত। রাতে সামান্য আওয়াজে ঘুম হতো না। কিন্তু জ্ঞান হওয়ার পর সেই সব ভূতের ভয় মন থেকে চলে গেলেও চারপাশে হাজারও ভূতের আনাগোনা চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নিচ্ছে দিনের পর দিন। গাছপালা, ঝোপঝাড়, কবর কিংবা নদীনালা ছেড়ে ভূতেরা বাসা বেঁধেছে এই দেশের ঘাড়ে, পানির লাইন, কারেন্টের তারে, অফিস আদালতসহ নানা জায়গায়। এমনকি ভূতের ভয়ে সত্যকে সত্য বলাও মানা। তবে এই সব ভূত তাড়াতে হলে শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে। ঘুমের মাঝে না থেকে জেগে উঠতে হবে। তাই ছড়াকার ছড়াটির মধ্যে দিয়ে মানবজ্বীনের পুতকে জেগে ওঠার আহবান করেছেন।
এমনকি জেগে ওঠা ছাড়া মুক্তিও সম্ভব নয়। অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপোষ নয় চাই প্রতিরোধমূলক মনোভাব।

সবশেষে একথা নিঃসন্দেহে বলতে পারি ' জ্বীন পরী ও ভূতোং ' ছড়াগ্রন্থটি একবার পড়লে নিশ্চয়ই পাঠকের হৃদয়ে দাগ কেটে যাবে। সবকয়টি ছড়াতেই রয়েছে চমৎকার বার্তা। এছাড়া ছোট বড় সবার জন্য শিক্ষণীয় একটি বই। তাই আপনি নিজে পড়ুন এবং আপনার ছোট ছোট সোনামণিদের হাতে তুলে দিন। আমি বইটির সাফল্য কামনা করছি। হাতে হাতে পৌঁছে যাক প্রিয় বইটি।

বুক রিভিউ
লেখক : মাহফুজুর রহমান আখন্দ
গ্রন্থ : জ্বীন পরী আর ভূতোং
ধরণ: ছড়াগ্রন্থ
প্রকাশনী: অন্যথা
প্রচ্ছদ : ফারজানা পায়েল



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top