বই আলোচক: শাকিলা আক্তার পাঁপড়ি

অরিয়েন্টালিজম: এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ

শাকিলা আক্তার পাঁপড়ি | প্রকাশিত: ৯ জানুয়ারী ২০২১ ০৭:৪০; আপডেট: ১৩ জানুয়ারী ২০২১ ০৯:৫৯

বুকোগ্রাফি- দোলা ইসলাম

প্রিয় বান্ধবীর সাথে ফোনে কথা হচ্ছিলো বেশ কদিন বাদে। আমাদের সখীদ্বয়ের নানান কথার মাঝে উঠে এলো অসাধারণ এক মুভির কথা। উভয়েই বললাম, "এটা অস্কার পাবার মতো সিনেমা।"
ভেবে দেখলাম, ভালো কোন সাহিত্য সৃষ্টি হলে আমরা নোবেল প্রাইজের প্রত্যাশায় মাতি। জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে উৎকৃষ্ট কিছু সৃষ্টিতে এমনকি মানব কল্যাণমূলক কোন কাজেও সেই চাওয়া ভর করে।

এর কারণ কী?
কারণ, অস্কার এবং নোবেল হলো সেই মানদন্ড যা পাশ্চাত্য তৈরি করে দিয়েছে।
উপনিবেশিকতার দীর্ঘ শাসনামলে পাশ্চাত্য কর্তৃক আরোপিত চিন্তার অধীনে প্রাচ্য এমনভাবে প্রভাবিত হয়েছে যে, প্রাচ্য আর প্রাচ্য থাকেনি। সে পাশ্চাত্যের চশমার কাঁচে নিজেকে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।

আধিপত্যের প্রভাবের ইতিহাস, উপনিবেশবাদ ও মিশ্র সংস্কৃতিবাদের ব্যাপক প্রয়োগ ঘটার বিবরণ জানানো এক বইয়ের গল্প করবো আজ।

পন্ডিত, নন্দনতাত্ত্বিক ও সমালোচকের বিরল ও মেধাবী সংশ্লেষ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আমেরিকান লেখক এডওয়ার্ড ডাব্লিউ সাঈদ রচিত এই বইটির নাম "অরিয়েন্টালিজম"।
বাংলায় অনুবাদক ফয়েজ আলম যার পারিভাষিক নাম দিয়েছেন "প্রাচ্যতত্ত্ব"।

অরিয়েন্টালিজম হলো মানববিজ্ঞানের বিভিন্ন দিকে সুগভীর প্রভাব তৈরি রাখা জ্ঞানের একটি শাখা। যার প্রাতিষ্ঠানিক ধারণার বিকাশ ঘটে ১৮ শতকের শেষ থেকে ১৯ শতকের প্রারম্ভের দিকে।
পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বুদ্ধিজীবী মহল পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন অনুষঙ্গ নিয়ে আলোচনাকে অরিয়েন্টালিজম নাম দিয়েছেন।
অর্থাৎ, পূর্বাঞ্চলের ফ্রেমকে তারা অরিয়েন্ট বলেছেন এবং এই ফ্রেমকে নিয়ে জ্ঞানমূলক বিশ্লেষণের শাখাগুলোকে বলেছেন অরিয়েন্টালিজম।
এবং এই ধারণার মূলে ছিলো পৃথিবীর মানচিত্রের পূর্ব ও পশ্চিমের অঞ্চল একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠার কাহিণী।

অরিয়েন্টালিজমের মূল উদ্দেশ্য হলো পূর্বাঞ্চলের সমাজ কাঠামোর প্রাচীন বিষয়গুলো যেমন- ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, আইন সহ যে বিষয়গুলো সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে সেগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ।
এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্লেষণটি হয়েছে পশ্চিমাঞ্চলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।

তবে অরিয়েন্টালিজমে সাঈদ মূলতঃ মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে বেশি আলোচনা করেছেন। বইটিতে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর উপর ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের ইতিহাস রচনা করেন।

সম্পদশালী প্রাচ্য ছিলো পাশ্চাত্যের সবচেয়ে পুরনো ও বড় বড় উপনিবেশের অঞ্চল। সে ছিলো পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এশিয়াতে উপনিবেশক শাসক হিসেবে আমরা পর্তুগিজ, ফ্রান্স, ব্রিটেন, ডাচদের আগমন অবলোকন করি। এবং তাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে ভূমিকা দেখতে পাই প্রাচ্যতত্ত্বের।

পৃথিবীর ইতিহাসে একটা সময় ছিলো যখন বলা হতো, বৃটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না। অর্থাৎ পূর্ব পশ্চিম মিলে সর্বত্র তার শাসন প্রতিষ্ঠা ছিলো।
এবং ইউরোপে শুরু হওয়া শিল্প যুগ ছিলো সে উপনিবেশিকতার একটি সহায়ক শক্তি। নিজেদের কল কারখানাগুলো চালু হবার পর উৎপাদনের যোগান দেবার জন্য সম্পদশালী পূবের দেশগুলোতে তারা উপনিবেশবাদের বিস্তৃতি বাড়িয়েছে।
যেমন- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সম্পদ লুটপাট করে নিয়ে নিজ দেশে প্রক্রিয়াজাত করতো। উৎপাদিত পণ্য আবার ফেরত পাঠাতো এখানে। পুঁজি সবসময় তার বিনিয়োগ ফেরত চায়। তাই বৃটিশরা এখানে যে বিনিয়োগ করেছে তার বহুগুণ ফেরত নিয়েছে।
এটি করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছে একটি শ্রেণি।

অর্থাৎ প্রক্রিয়াটি এমন ছিলো যে, একটি দেশ থেকে কিছু মানুষ অন্য দেশে গিয়ে দখলদারিত্ব কায়েম করার জন্য প্রথমে ব্যবসায়ীরা গিয়েছে। এরপর সমর শক্তি। সবশেষে প্রশাসন গিয়ে সেখানে একটি প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে কাজ শুরু করেছে। ফলশ্রুতিতে ভীত মজবুত হয়েছে উপনিবেশিকতার।

সাঈদ বলেন, দূর ও অজানা প্রাচ্যকে নিজের কল্পিত ধারণা মতে সাজায় পাশ্চাত্য। নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করা পশ্চিম, পূর্বকে সাজায় নিকৃষ্টতার ছাঁচে। নিজস্ব চিন্তার মডেলে।
প্রাচ্যতত্ত্বের এই বদ্ধমূল ভুল ধারণা নিয়েই বছরের পর বছর ঔপনিবেশিকেরা এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।
ইউরোপীয় ও আমেরিকান শক্তি প্রাচ্যের উপর সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য চালানোর পাশাপাশি প্রাচ্যের মানুষের মন, আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক স্বভাবের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে।

সংস্কৃতি হলো যে কোন জাতির মূল সত্তা। সংস্কৃতি ছাড়া কোন জাতি, সভ্যতা চলতে পারে না। সূক্ষ্ম চিন্তার অধিকারী পশ্চিমারা তাই চিন্তার উপনিবেশিকতা ঢুকিয়ে দিয়েছে পূর্বের সংস্কৃতিতে। আঘাত করেছে এখানকার সংস্কৃতিতে। কাজ করেছে এ অঞ্চলের ভাষা নিয়ে। ভাষার ভিতর ঢুকে গিয়ে ভাষা চিন্তা দিয়ে প্রাচ্যের সংস্কৃতি চিন্তাকে খাটো করে ফেলেছে। তখন উচ্চ শ্রেণি, নিম্ন শ্রেণি এই বিভাজনে বিভক্ত হয়ে পড়েছে পূর্বাঞ্চল।
সাংস্কৃতির আগ্রাসন বুঝিয়ে দিলো, প্রাচ্যের শিল্প মানে নিম্ন মানের শিল্প আর পাশ্চাত্যেরটা উচ্চমানের।
সেই সুগভীর প্রভাবে প্রভাবান্বিত আমরা তাইতো আজও গ্যালারি আর্টকে হাই আর্ট বলি। তাচ্ছিল্যের চোখে দেখি আমাদের রিকসা আর্টকে।

১৯৭৮ সালে রচিত "অরিয়েন্টালিজম"এ সাঈদ জানান, এশিয়া ও আরবের যে সমাজচিত্র পশ্চিমের বুদ্ধিজীবীরা বাদবাকী পুরো বিশ্বের সামনে অঙ্কণ করেছে তাতে প্রকৃত দৃশ্যপট ফুটে উঠেনি। তিনি মনে করেন, এতে অনেক ভুল ধারণা মিশ্রিত।
কারণ, উপনিবেশিক শক্তিরা নিজেদের সামগ্রিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট উপায়ে এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং এ অঞ্চলের ধরণকে ব্যাখ্যা করেছে। কর্তৃত্ব প্রসারে নিজেদের শাসন কাঠামোকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পরিবর্তন এনেছে এখানকার সামজ কাঠামোর অনুষঙ্গগুলোতে।

উপনিবেশিক শক্তির প্রভাবে আমাদের মনোজগত যে প্রভাবিত হয়েছে তা বোঝানোর জন্য লেখক "পোস্ট স্ট্রাকচারালিজম" তত্ত্বটি ব্যবহার করেছেন। পক্ষপাতদুষ্ট পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি কিভাবে আমাদের মাঝে আজও সুপ্ত আছে তাত্ত্বিকভাবে দেখিয়েছেন।
তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রাচ্যবাদ আমাদের জীবনাচরণে, মানসিকতায় এমন এক বাতাবরণ তৈরি করে দিয়েছে যে, পশ্চিম ছাড়া আমরা অসম্পূর্ণ।

যখন কোন শাসক অন্য দেশে গিয়ে সেখানকার সংস্কৃতি থেকে তাকে চ্যুত করে ফেলতে চায় সে প্রক্রিয়ার নাম হলো Othering.
Other হলো নিম্নবর্গীয়তার একটি রূপ।
অর্থাৎ উপনিবেশিক শাসক হলো মূল সত্তা (Self), বাকী সব হলো ভিন্ন (Other).

অরিয়েন্টালিজম যদিও মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক আগ্রাসনের বিশ্লেষণ নিয়ে লিখিত তবুও অনুবাদক ফজলে আলম মনে করেন, অরিয়েন্টালিজমের তাত্ত্বিক দিকটি পৃথিবীর যেকোন সময়ের যেকোন অঞ্চলে সংগঠিত সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিশ্লেষণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যে কোন সাংস্কৃতিক আধিপত্য/প্রভাবন/বিকৃতি সাঈদের তত্ত্বে বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
এ কারণে সাঈদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের পাশাপাশি "অরিয়েন্টালিজম" উত্তর উপনিবেশবাদ নিয়ে পড়াশুনার ক্ষেত্রেও ফান্ডামেন্টাল একটি বই।

পশ্চিমাদের সমর শক্তি, প্রশাসকরা পূর্ব ছেড়ে চলে যাবার ইতিহাস আজ শত বছরেরও পুরনো। কিন্তু যেটি যায়নি সংস্কৃতির উপনিবেশবাদ বা আগ্রাসন। আমাদের পুলিশ ব্যবস্থা আজও চলছে ১৮৬১ সালের উপনিবেশি আইনের অধীনে। কেন্দ্র ও কাঠামোমুখী উপনিবেশবাদে প্রভাবিত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ চায়। ভালো ফলাফল চায়। কিন্তু এমন মানুষ ক'জন তৈরি হয় যারা নিজস্ব চিন্তার আলোয় চারপাশ উদ্ভাসিত করতে পারে?
আজও আমাদের মেধার পাচার হয়!

প্রভাবমুক্ত উত্তর উপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা হলো গুরুমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা। প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে মানবিক মানুষ তৈরি করা যার মূল লক্ষ্য ছিলো।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিলো, "ভালো বই কাকে বলে?"
স্যার উত্তরে বলেছিলেন, "যে বইটা পাঠককে ভাবায়, সেটিই ভালো বই"।

উপনিবেশিকতার ইতিহাস পাড়ি দিয়েও দীর্ঘ শত বছর পরেও আমরা কী করে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির আয়নায় আজও নিজেদের চেহারা দেখি সেটি আপনাকে ভাবাবে "অরিয়েন্টালিজম"।
তাহলে ভাবনার খোরাক রেখে যাওয়া এ ভালো বইটি না পড়লে হবে কেন?

বই : অরিয়েন্টালিজম
লেখক : এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ
অনুবাদক : ফয়েজ আলম
প্রচ্ছদ : মাহবুব কামরান
প্রকাশনী : র্যমন পাবলিশার্স, ঢাকা
পৃষ্ঠা : ৪১৬
মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০ টাকা



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top