ডলারের ঊর্ধ্বমুখিতা, বাড়ছে সরকারি ব্যয়

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২২ ০৭:০৮; আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৭:৩০

ছবি: সংগৃহিত

মুদ্রাবাজারে ঊর্ধ্বমুখি ডলারের দাম। দিনের পর দিন তা বেড়েই চলেছে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় বাড়ছে সরকারের। বিদ্যুতের মূল্য ডলারে নির্ধারিত হওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো (আইপিপি) থেকে বিদ্যুৎ কিনতে আগের চেয়ে বাড়তি অর্থ পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি)। এতে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি দায়দেনার বোঝা আরো বাড়তে যাচ্ছে। খবর বণিক বার্তার।

একক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে চুক্তিতে পূর্বনির্ধারিত মূল্যে আইপিপিগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনে বিপিডিবি। এক্ষেত্রে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্য নির্ধারণ করা হয় মার্কিন সেন্টে (ডলারের ক্ষুদ্রতম একক, ১০০ সেন্ট = ১ ডলার) প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা হিসেবে। তবে তা পরিশোধ করা হয় বাংলাদেশী টাকায়। এ অনুযায়ী ডলারের বিনিময় হার বাড়লে বিদ্যুৎ ক্রয়ে বিপিডিবির ব্যয়ও বেড়ে যায়। বিদ্যুতের ক্রয়মূল্যকে এভাবে ডলারের বিনিময় হারের সঙ্গে বেঁধে দেয়ার বিষয়টিকে অভিহিত করা হয় ডলার ইনডেক্সেশন হিসেবে। শুধু দেশী উদ্যোগে গড়ে ওঠা ৩০ মেগাওয়াটের কম সক্ষমতার আইপিপির ক্ষেত্রে এ নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টের আওতায় গড়ে ওঠা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকেও এ ডলার ইনডেক্সেশনের ভিত্তিতেই বিদ্যুৎ কেনে বিপিডিবি।

ডলার ইনডেক্সেশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ডলারের বিনিময় হার যখন ৮৫ টাকা ছিল, সে সময় প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা ১০ সেন্টে বিক্রির জন্য চুক্তিবদ্ধ আইপিপিকে বিপিডিবির প্রতি ইউনিটে পরিশোধ করতে হয়েছে সাড়ে ৮ টাকা করে। আবার প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৯৫ টাকায় দাঁড়ালে এ ক্রয়মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৯ টাকায়।

বর্তমানে মুদ্রাবাজারে ডলারের বিনিময় হার বাড়ছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। খাতসংশ্লিষ্টদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে বিষয়টি। তাদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরেই লোকসানের বোঝা টানতে হচ্ছে বিপিডিবিকে। ডলার ইনডেক্সেশনের কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে সংস্থাটির লোকসানের বোঝা আরো ভারী হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে শঙ্কা তৈরি হয়েছে খাতটিতে সরকারের দায়দেনা আরো বেড়ে যাওয়ারও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষেও দেশে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। এ বছরের এপ্রিলে তা দাঁড়ায় ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সায়। মে মাসে এটি আরো বেড়ে হয় ৮৯ টাকা। জুন শেষে প্রতি ডলারের বিনিময় হার দাঁড়ায় ৯৩ টাকা ৪০ পয়সায়। গত মাসের শেষে এটি ছিল ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ টাকায়।

বাংলাদেশে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির ধাক্কা শুধু বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৪ সালে সংশোধিত প্রাইভেট সেক্টর পাওয়ার জেনারেশন পলিসি অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের ট্যারিফ কাঠামোর অংশ হলো দুটি। এর একটি হলো ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, অন্যটি এনার্জি পেমেন্ট। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পরিশোধ করা হয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার ভিত্তিতে দুটি ভাগে। এর মধ্যে বৃহদংশ দেয়া হয় বিদেশী ঋণ পরিশোধ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফিক্সড কস্ট বা অপরিবর্তনশীল ব্যয় নির্বাহের জন্য। এরও বড় একটি অংশ শুরুতেই ডলারে নির্ধারিত হয়। এ ব্যয়ও ডলারের ওঠানামার সঙ্গে সংগতি রেখে টাকায় পরিশোধ করা হয়। অন্যদিকে এনার্জি পেমেন্টের আওতায় পরিশোধ করা হয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তনশীল ব্যয়। এক্ষেত্রে পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানির ব্যয় এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এটি দেশী মুদ্রায় পরিশোধ করা হলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা এক্ষেত্রে বড় প্রভাবকের ভূমিকা রাখে।

সব মিলিয়ে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এখন দেশের আইপিপি-নির্ভর বিদ্যুৎ খাত নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি করছে। গত অর্থবছরে বিপিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৫৯ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু আইপিপি ও এসআইপিপিগুলোকে পরিশোধের জন্য ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা, যা মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রায় ৬৪ শতাংশ।

তবে আইপিপির উদ্যোক্তারা দাবি করছেন, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে লোকসানে আছেন তারাও। বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) প্রেসিডেন্ট ইমরান করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমরা ব্যাপক হারে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। মূলত জানুয়ারি থেকেই আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। কারণ বিপিডিবি আমাদের জানুয়ারির জ্বালানি তেলের খরচ মার্চে দেয়ার কথা। কিন্তু তারা সেটি দিচ্ছে মে মাসে। যদিও জানুয়ারিতে ডলারের যে বিনিময় মূল্য ছিল, সে হারেই আমাদের অর্থ পরিশোধ করেছে। মে মাসের দর অনুসারে দেয়নি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সিলিং রেট অনুযায়ী ডলারের দাম ৯৫ টাকা বেঁধে দেয়া হলেও খোলাবাজারে এর দাম আরো বেশি। ফলে আমরা যে দরে ডলার কিনছি আর আমাদের যে দরে অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে, সেখানে একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। তবে সরকারের সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি রয়েছে, সেখানে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কিছু ধারা রয়েছে। যদিও এটি কখনো কাজে লাগানো হয়নি। বর্তমানে আমরা এ ধারা অনুসারে সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য কাজ করছি। এতেও আমাদের পুরো ক্ষতি পোষানো সম্ভব হবে না। জ্বালানি তেল কিনতে আমাদের ১০০ টাকা ব্যয় হলেও এর মাধ্যমে হয়তো ৩০-৩৫ টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। বাকিটা লোকসান গুনতে হবে। মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমাদের ক্ষতির বিষয়টি জানিয়ে বিপিডিবিকে গত মাসে চিঠি দেয়া হয়েছে। অবশ্য এখনো সে চিঠির কোনো জবাব আসেনি।

বেসরকারি বিদ্যুৎ উদ্যোক্তারা প্রতি মাসে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করেন। মূলত বিপিসির মাধ্যমে এ জ্বালানি তেল তারা আমদানি করেন। এর ব্যয় আইপিপিগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন বিলের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে বিপিডিবির কাছ থেকে এ অর্থ তুলে নেয়। কিন্তু বিপিডিবি বিল পরিশোধে বিলম্ব করায় বর্তমানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলসি খুলতে পারছেন না তারা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা আমদানি করেন, বিশেষত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বিপিডিবির পেমেন্ট বেড়ে যাবে। এতে ক্ষতিও বাড়বে সংস্থাটির।

বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারদরে অস্থিতিশীলতার কারণে এখন বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। সংস্থাটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় (নিট) গত অর্থবছরে আগেরবারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সংস্থাটির বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিজস্ব ব্যয় ছিল ৬ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে তা প্রাক্কলন করা হয়েছে ১১ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে জ্বালানির ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি এর সঙ্গে অতিরিক্ত চাপ যুক্ত করতে যাচ্ছে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধিও।

প্রতি বছরই দেনা বাড়ছে বিপিডিবির। ভর্তুকি দিয়েও তা কমানো যাচ্ছে না। এর মধ্যেও আইপিপি থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে তা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে সংস্থাটিকে। এর সঙ্গে চলতি অর্থবছরে যুক্ত হচ্ছে পায়রা ও রামপালের মতো যৌথ বিনিয়োগভিত্তিক বড় প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয়ও। এ চাপকে এবার আরো ব্যাপক মাত্রায় বাড়িয়ে দেবে বিদ্যুৎ ক্রয়ে ডলার ইনডেক্সেশনের বিধি। অন্যদিকে এর মধ্যেই কোনো কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে না এলেও চলতি অর্থবছরেই এগুলোর দেনা পরিশোধ শুরু হচ্ছে।

২০৪১ সালের মধ্যে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ হাজার মেগাওয়াটে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এজন্য স্থানীয় ও বিদেশী বিভিন্ন উত্স থেকে ঋণ নিয়ে বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাত পরিচালনা করতে গিয়ে সরকারি কোম্পানিগুলোর দায়দেনাও বেড়েছে। সব মিলিয়ে গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে খাতটিতে মোট দায়দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।

দেশের বিদ্যুৎ খাতে মোট দায়দেনার বৃহদংশই তৈরি হয়েছে বিদেশী ঋণে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে গিয়ে। সরকারের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দেনার পরিমাণ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য গৃহীত বিদেশী ঋণের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ খাতে সরকারের মোট দায়দেনার পরিমাণ ২ লাখ ১৮ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সরকারি বকেয়া পরিশোধ বাকি রয়েছে ৭৮ হাজার ৯১ কোটি টাকা। এ বকেয়া সবচেয়ে বেশি বিপিডিবির। সংস্থাটির সরকারি বকেয়া পরিশোধ বাকি রয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাকি ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকার দায় তৈরি হয়েছে বিদেশী ঋণে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে গিয়ে।

তবে এ বিপুল পরিমাণ ব্যয় ও দায়দেনা সত্ত্বেও দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এ সক্ষমতার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে প্রায় অর্ধেক। আইপিপি-নির্ভর বিদ্যুৎ খাত চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারায় সারা দেশে এখন লোডশেডিংয়ের মাত্রাও বেড়েছে, যা গৃহস্থালি ও শিল্প খাতসহ সার্বিক অর্থনীতিতেই ক্ষত বাড়াচ্ছে।



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top