বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন: স্বাধীন কমিশন চায় জাতিসংঘ

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০২২ ০৭:০৭; আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৭:১৩

ফাইল ছবি

ঢাকায় সফররত জাতিসংঘ মানবাধিকার সংক্রান্ত হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। খবর যুগান্তরের।

কমিশনপ্রধান কে হতে পারেন, তা উল্লেখ না করে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট রেসিপি নেই। একেক দেশে একেক রকমের হয়। কোথাও বিচার বিভাগীয় কেউ, কোথাও স্বাধীন কোনো ব্যক্তি প্রধান হয়ে থাকেন।

তবে কমিশনপ্রধানকে অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। তার থাকতে হবে সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট। নির্বাচনকে সামনে রেখে চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সুশীল সমাজের জন্য স্পেস সৃষ্টি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ করা জরুরি।

সামাজিক অস্থিরতা ও ক্ষোভ দমনেও সংলাপ প্রয়োজন। জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধান করা হলে পরস্পরের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সুশীল সমাজের সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে।

কিন্তু জাতিসংঘ মানবাধিকার রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, সুশীল সমাজের জন্য স্পেস সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। তাদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে অনেকে সেলফ সেন্সরশিপ করেন।

এনজিও নিয়ন্ত্রণে আইন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করায় তাদের কার্যকরভাবে কাজ করা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে যাচ্ছে।

এই সময়ে কার্যকর গণতান্ত্রিক ও সিভিক স্পেস এবং চেকস ও ব্যালেন্স, জবাবদিহি সৃষ্টি জরুরি। নির্বাচনের সময়কাল হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার, মানবাধিকার কর্মীদের কাজ করার অধিকার, বিরোধী দল ও সাংবাদিকদের কাজ করার অধিকার নিশ্চিত করাসহ রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের জন্য স্পেস সৃষ্টি সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। অতিমাত্রায় বল প্রয়োগ না করে প্রতিবাদ বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের কৌশল রপ্ত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ দরকার।

মিশেল ব্যাচেলেট চার দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে বুধবার অপরাহ্নে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিমত ব্যক্ত করেন। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

তিনি পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, আইন ও শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সুশীল সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। ধানমন্ডিতে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিসে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বক্তৃতা করেছেন। ঢাকার বাইরে কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন এবং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন।

জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ শুধু দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অধিকার গ্রুপ উত্থাপন করেছে এমন নয়; বরং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও স্বীকার করেছে যে, নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।

যদিও বিভিন্ন অধিকার গ্রুপ যত ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করে জাতীয় কমিশন ততটা করেনি। কিন্তু এটা তো ঠিক যে, বাংলাদেশের নিজস্ব কমিশনও অভিযোগ স্বীকার করেছে।

এসব অভিযোগ অস্বীকার না করে বরং স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করা যেতে পারে। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া না যায় তবে কোনো কথা নেই। তবে তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে তার প্রতিকার করতে হবে।

কোনো দেশের উন্নতি বলতে শুধু জিডিপি অর্জনকেই বোঝায় না; বরং পাশাপাশি মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন। এসব প্রসঙ্গ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে তুলেছি। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ বলেছে, হ্যাঁ, আমরা এটা বুঝতে পারি।

তাই অভিযোগগুলো শুনতে হবে। এর জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করে সাড়া দিতে হবে। মিশেল এ সময় উল্লেখ করেন, তিনি নিজে একজন ডাক্তার। এখন ডাক্তার হিসাবে যদি আগে স্বীকার না করি যে কোনো রোগ আছে; তবে চিকিৎসা করা যাবে না।

রোগ সারানো যাবে না। এ কারণে মানবাধিকার প্রশ্নে সরকারকে প্রস্তাব করেছি যে, প্রথমে একটা মেকানিজম করে তা তদন্ত করতে হবে। সেই মেকানিজমটা বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। তাকে স্বাধীনতা দিতে হবে। ম্যান্ডেট ও রিসোর্স দিতে হবে।

এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের সঙ্গে তার আলোচনার ফলোআপ করবেন ঢাকায় জাতিসংঘ দপ্তরের মানবাধিকার উপদেষ্টা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে মিশেল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেছেন যে, ১৯৭৫ সালে তিনি আততায়ীর হাতে তার পিতাকে হারিয়েছেন। ফলে তিনি মানবাধিকারের বিষয়ে সজাগ।

মিশেল বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়তো আপনার সরকারের পলিসি নয়; কিন্তু তারপরও ঘটনা ঘটতে পারে। আসুন, ওইসব ঘটনা বিশ্লেষণ করি, তদন্ত করি।

যদি তদন্তে কোনো কিছু ঘটেনি প্রমাণ হয় তবে কোনো কথা নেই। কিন্তু তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে তার প্রতিকার অবশ্যই করতে হবে।

বাংলাদেশের ৭৬ জন নাগরিক গুম হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

প্রয়োজনে আমাদের দপ্তর এ বিষয়ে সহায়তা করবে। অনলাইনে অপব্যবহার রোধে সরকারের আইন প্রণয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হেইট স্পিচ এবং সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে এমন আইনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবশ্যই অবলম্বন করতে হবে।

কেননা এসব আইনের মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। ওটি নিয়ন্ত্রণে আইনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রীতিনীতির প্রতি সজাগ থাকতে হবে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান নির্বাচনের আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে জাতীয় সংলাপ করার প্রস্তাব রাখেন। তিনি বলেন, অধিক হারে জাতীয় সংলাপ করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট জটিল। কোভিড মহামারি হয়েছে। তারপর পরিস্থিতি এখন যা তাতে রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের মধ্যে সংলাপ প্রয়োজন। সংলাপ ৪/৫/৬ এভাবে নম্বর দিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করতে পারে। জাতীয় সংলাপ জরুরি।

নির্বাচনের সময়টা খুবই ভিন্ন ধরনের সময়। এখন সংলাপ হলে রাজনীতিবিদরা একত্রিত হবেন। তারা সব বিষয়ে একমত হবেন এমন নয়। তারা একত্রিত হলে নিজেদের মধ্যে এবং প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থার সৃষ্টি হবে।

তারা পরস্পরের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন মতপ্রকাশের বিষয়ে একমত হতে পারেন। আজ অনেক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে।

এসব বিষয়েও সংলাপে একমত হওয়া যায়। সুশীল সমাজের সমালোচনাধর্মী কণ্ঠস্বর সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য উপযুক্ত। যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রথম শর্ত হলো সমস্যাকে স্বীকার করা।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তাদের ফেরত পাঠানোর উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

রোহিঙ্গাদের ওপর মানব ইতিহাসে সর্বোচ্চ সহিংসতা চালানো হয়েছে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন প্রথমে সতর্কঘণ্টা বাজিয়েছিল। এখন রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিচার আন্তর্জাতিক আদালত আইসিজে ও আইসিসিতে হচ্ছে।

গণহত্যার বিচার রোয়ান্ডায় হয়েছে। ভলকান দেশগুলোয় হয়েছে। গাম্বিয়ার মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গণহত্যা বন্ধ করতে বলা হয়েছে। তারপরও তরুণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে আশা দেখতে পেয়েছি।

তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়। তাদেরকে মিয়ানমারে মর্যাদার সঙ্গে পুনরায় অন্তর্ভুক্তি ঘটাতে হবে। তবে বাংলাদেশের ওপর বোঝা সৃষ্টি হওয়ায় রোহিঙ্গাদের প্রতি ঘৃণার মনোভাব দেখা যাচ্ছে।

এটা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। এটা যাতে ঘটতে না পারে, এজন্য প্রয়োজনীয় কাজ করতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

তিনি জানান, সেপ্টেম্বরে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘ রেপোটিয়ার বাংলাদেশে আসবেন। বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করছে, সেটা অবশ্যই স্বস্তিদায়ক।

কোন ম্যাজিকে তিনি বাংলাদেশে আসার অনুমতি পেলেন জানতে চাইলে মিশেল বলেন, এটা ঠিক আমাকে আগেও বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমি সময় করতে পারছিলাম না।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকারের অনেক কিছুর সদস্য। আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছি। ভবিষ্যতে রেপোটিয়াররা আসবেন। তাদের সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করায় ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়ন ঘটিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাতৃমৃত্যুরোধ, শিশুমৃত্যুরোধে অনেক অগ্রগতি করেছে। তবে বাংলাদেশের সামনে মানবাধিকারের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

মূল খবরের লিঙ্ক



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top