প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর বাতিল

রাজটাইমস ডেস্ক:  | প্রকাশিত: ২৫ নভেম্বর ২০২২ ১৯:৩৬; আপডেট: ২৮ জানুয়ারী ২০২৩ ১৯:১৩

ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফর স্থগিত হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার আমন্ত্রণে ২৯ নভেম্বর তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে শেখ হাসিনার জাপানে যাওয়ার কথা ছিল। খবর বণিক বার্তার। 

তবে গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে এক সম্মেলনের অংশ হিসেবে জাপানের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর সফর স্থগিতের কথা জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

গতকাল ছিল ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) ২২তম সম্মেলনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। এতে অংশ নেন ১৬টি দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা, যার অংশ হিসেবে দুপুরে বৈঠক হয় বাংলাদেশ ও জাপানের। দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তাকেই শুনসুক। তার সঙ্গে বৈঠক শেষেই শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আমরা এখন পর্যন্ত দিইনি। কূটনীতির ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা-অসুবিধা থাকে, যে কারণে শেষ মুহূর্তে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের যে তারিখের কথা আগে উল্লেখ করা হয়েছিল, সেই তারিখে সফরটি বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে হচ্ছে না। তবে শিগগিরই হবে। আমাদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট আছে, এমওইউ ও এগ্রিমেন্ট আছে; যেগুলো প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সফরে স্বাক্ষর হবে বলে আমরা আশা করছি।

জানা গিয়েছে, জাপানের অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যা ও কভিড পরিস্থিতিসহ একাধিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সফর স্থগিত করা হয়েছে। তবে দ্রুতই নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

এর আগে গত ২৭ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছিলেন, নভেম্বরের শেষে জাপানে যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সফরটির আমন্ত্রণ এসেছিল জাপানের পক্ষ থেকে। এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার আমন্ত্রণে ২৯ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফর করবেন। এ সফর বাংলাদেশ ও জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ পর্যায়ে উন্নীত করবে বলে আশা করা হচ্ছিল।

ঢাকায় অনুষ্ঠিত আইওআরএ সম্মেলনের সার্বিক বিষয় নিয়ে গতকাল বিকালে ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন বিষয়ে ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর সফর বাতিলের কারণ জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাপানে বর্তমান সরকারের তিনজন মন্ত্রী এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন। এ পরিস্থিতিতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী নতুন নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন।

আমরা গোটা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। তারা আমাদের দাওয়াত দিয়েছেন, আর সে সময় যদি তাদের নিজেদের ঘরেই সমস্যা থাকে। তাই আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের যে অবজেক্টিভ সেগুলো কীভাবে অর্জিত হবে, সেসব বিবেচনায় রেখে আমরা চিন্তাভাবনা করছি। এছাড়া আছে কভিড পরিস্থিতি। জাপানে এখনো সবাইকে কোয়ারেন্টিন করতে হচ্ছে। শুধু কোয়ারেন্টিন নয়, একটা রেস্ট্রিকশন মবিলিটি আছে। প্রধানমন্ত্রী গেলে তার সঙ্গে তো ব্যবসায়ীসহ বেশ বড় দল যাবে, এসব একাধিক বিষয় বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

জানা গিয়েছে, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তার দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সঙ্গে ইউনিফিকেশন চার্চের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি সামনে আসতে থাকে। আবের হত্যাকারীর দাবি ইউনিফিকেশন চার্চের কারণেই তার মা দেউলিয়া হয়ে পড়েছিলেন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন এলডিপির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনপ্রিয়তা হারাতে থাকেন ফুমিও কিশিদা। তার জনপ্রিয়তায় আরো ধস নামে যখন তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আবের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করেন। এর মধ্যেই ইউনিফিকেশন চার্চের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় অভিযুক্ত হওয়ার পর গত মাসের শেষ দিকে পদত্যাগ করেন জাপানের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন-বিষয়ক মন্ত্রী দাইশিরো ইমাগিওয়া। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে হালকা চালে মন্তব্য করে চলতি মাসের মাঝামাঝি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেন বিচারমন্ত্রী ইয়াসুহিরো হানাশি। সর্বশেষ গত সোমবার পদত্যাগ করেন বেশ কয়েকটি তহবিলের ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়া স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগমন্ত্রী মিনোরু তেরাদা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, স্থগিত হওয়া জাপান সফরে দেশটির সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি ‘লেটার অব ইনটেন্ট অন ডিফেন্স কো-অপারেশন’সহ সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা ছিল। সফরের উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় ছিল দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃতি রূপান্তর। এতদিন বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ধরন ছিল বিস্তৃত অংশীদারত্ব বা ‘কমপ্রিহেনসিভ রিলেশনশিপ বা পার্টনারশিপ’। এখন সম্পর্কটা কৌশলগত অংশীদারত্ব বা স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপে রূপান্তর করার পরিকল্পনা চলছে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি কিংবা পিটিএর লক্ষ্যে সমীক্ষার জন্য সমঝোতা হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রোহিঙ্গা সমস্যার মতো বিষয়ে সহযোগিতাও সফরের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে।


জানা গিয়েছে, ‘দ্য বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বির আওতায় বাংলাদেশকে গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ ঋণসহায়তা দিয়েছে জাপান। আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহযোগিতা (ওডিএ) হিসেবে পাওয়া এ ঋণের অর্থ কাজে লাগিয়ে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মতো বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে বাংলাদেশে। ওডিএর আওতায় বিভিন্ন দেশে ঋণসহায়তা দেয়াকে কূটনীতি ও ভূরাজনীতির বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ হিসেবে দেখে টোকিও। এটিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে গত কয়েক দশকে সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দাতা দেশ হয়ে উঠেছে জাপান। কিন্তু বর্তমানে দেশটির এ সহযোগিতা কার্যক্রম নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি করেছে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের অবমূল্যায়ন।

ইয়েনের ক্রমাগত অবমূল্যায়ন হওয়ায় ডলারে ঋণ দিতে গিয়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে জাপান। এ অবস্থায় টোকিওর কূটনৈতিক মহলে ঋণ ও সহায়তাগ্রহীতা দেশগুলোর সঙ্গে জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সম্প্রতি জাপান টাইমসকে জানিয়েছেন, ঋণগ্রহীতা দেশগুলোয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উপকরণ ক্রয় ও স্থানীয় পর্যায়ে শ্রমিক নিয়োগের জন্য ডলারের জোগান দেয়া দেশটির জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। উপরন্তু ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক শ্লথতা দেশটির সরকারের জন্য এরই মধ্যে বড় ধরনের চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় দেশে দেশে জাপানের ওডিএ ঋণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে গৃহীত বিগ-বি উদ্যোগের গতি শ্লথ হয়ে আসতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের অনেকে।

এনএ



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top