রাজনৈতিক চাপের অভিযোগে বিব্রত প্রশাসন
রাজশাহীতে নিয়োগেই প্রশ্নবিদ্ধ ফ্যামিলি কার্ড
শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২৬ ১৮:৫২; আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬ ২০:১৫
রাজশাহীতে সরকারের আলোচিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ নিয়ে একের পর এক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। জেলার গোদাগাড়ী, তানোর, বাগমারা, চারঘাট ও বাঘায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব, অনিয়ম এবং যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন, কোথাও নিয়োগের তালিকা বাতিলের দাবি উঠেছে। এমনকি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও রাজনৈতিক তদবিরের কারণে নিয়োগ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রার্থী। ফলে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নেওয়া এই কর্মসূচির তথ্যভান্ডার তৈরির আগেই মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েন।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। তাঁদের দাবি, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করেই স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। কোনো প্রার্থীর বিষয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনও বলছে, নিয়োগে অনিয়মের সুযোগ নেই এবং ইউএনওদের নীতিমালা মেনেই কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহীর কয়েকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ যেমন উঠেছে, তেমনি রাজনৈতিক দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকেও নিজেদের লোকজনকে ‘মূল্যায়ন’ করার দাবি সামনে এসেছে। ফলে ফ্যামিলি কার্ডের মতো রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় কতটা প্রভাব ফেলছে—সে প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
গত রোববার গোদাগাড়ীতে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের সামনে সমাবেশ শেষে তাঁরা ইউএনওর কার্যালয়ে গিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানান। তানোরে ৯৬ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ৯ জন সুপারভাইজার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নীতিমালা অনুসরণ না করে একটি পক্ষের প্রভাব ও সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সোমবার উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে তাঁরা তালিকা বাতিল এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পুনরায় নিয়োগের দাবি জানান। একই সঙ্গে ইউএনও নাঈমা খানের অপসারণের দাবিও তোলা হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান গণমাধ্যমকে বলেন, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করেই ফল প্রকাশ করা হয়েছে। কারও নিয়োগে অসংগতি পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।বাগমারাতেও একই ধরনের অভিযোগে মঙ্গলবার মানববন্ধন করেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ইউএনও ও সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তোলা হয়।
বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে নীতিমালা অনুসরণ করে করা হয়েছে। এখানে পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই। চারঘাটে অভিযোগ আরও গুরুতর। কয়েকজন প্রার্থী দাবি করেছেন, লিখিত পরীক্ষা ও অন্যান্য ধাপ পেরিয়েও রাজনৈতিক তদবিরের কারণে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। উত্তীর্ণদের তালিকা প্রকাশের পর পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক তদবির ছাড়া যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
চারঘাটে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে রাজশাহী মহিলা কলেজের এক অনার্স শিক্ষার্থীকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা। ওই শিক্ষার্থীকে মাদকাসক্ত আখ্যা দিয়ে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবারের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। তবে চারঘাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাশেদুজ্জামান বলেন, গোয়েন্দা তদন্ত প্রতিবেদনে ওই শিক্ষার্থীকে মাদকাসক্ত বলা হয়েছে। চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে কাউকে নিয়োগবঞ্চিত করা হয়নি।
বাঘায় নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে বিতর্ক শুরু হয় পরীক্ষার সময় থেকেই। প্রার্থীদের একাংশ দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ ও সার্ভার জটিলতার অভিযোগ করেন। ফল প্রকাশের পর বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন। পরে ফলাফল স্থগিত ও আবেদনের সময় বাড়ানো হয়। একই সময়ে ইউএনওকে বদলি করা হয়। তবে বিক্ষোভের সঙ্গে ইউএনওর বদলির কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার। তাঁর দাবি, এটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ।
রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, ফ্যামিলি কার্ডের মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ এখন শুধু চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগের বিষয় হয়ে নেই; এটি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা যেমন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগের অভিযোগ করছেন, তেমনি বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের কর্মীদের ‘মূল্যায়ন’ করার দাবিও উঠছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগে কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় বিবেচনায় এলে পুরো কর্মসূচির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতে প্রকৃত দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবার চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া এগোবে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহীদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখেছেন। ইউএনওদের নিয়োগের সম্পূর্ণ নীতিমালা অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা সেটিই করছেন। এখানে অনিয়ম করার সুযোগ নেই। তবে তিনি মনে করেন, নিয়োগের আবেদন প্রক্রিয়াটি মন্ত্রণালয় থেকে অনলাইনে করা হলে পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা সম্ভব হতো।
ফ্যামিলি কার্ডের মতো বৃহৎ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির শুরুতেই মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ নিয়ে এমন বিতর্ক তৈরি হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্তের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বাছাই প্রক্রিয়াই যদি রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে চূড়ান্ত সুবিধাভোগীর তালিকা কতটা নিরপেক্ষ থাকবে?

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: