সাবেক এমপি হারুন ইস্যুতে বিএনপির ভেতরেই অসন্তোষ

শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় উত্তপ্ত নবাবগঞ্জে রাজনীতি

শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ২ মার্চ ২০২৬ ১৪:২৪; আপডেট: ২ মার্চ ২০২৬ ১৬:৫০

ফাইল ফটো

সীমান্তঘেঁষা চরবাগডাঙ্গায় সহিংসতার ঘটনায় নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজনীতিতে। সীমান্তঘেঁষা এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ও আধিপত্যকেন্দ্রিক রাজনীতির জন্য আলোচিত। সাম্পতিক বোমা বিস্ফোরণে দু’জন নিহত হবার ঘটনা তারই বহি:প্রকাশ। ত্রয়োদশ নির্বাচনে পরাজয় বরণ করা সাবেক এমপি জামায়াতকে বিতর্কিত করার মূখ্য ভূমিকা পালন করছেন বলে জামায়াতের দাবী। বিএনপির একাংশের দাবী, নির্বাচনে পরাজয় বরণ করে হারুণ রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অপকৌশল হিসেবে জামায়াতের নাম জড়াচ্ছে। এ ঘটনায় সাবেক এমপি হারুনকে নিয়ে খোদ স্থানীয় ও জেলা বিএনপির মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি শনিবার ভোর ৫টার সময় সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউপির ফাটাপাড়ার একটি বাড়িতে শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে রানীহাটি ইউপির ধামার মোড় এলাকার আল আমীন (১৮) ও শিবগঞ্জ উপজেলার ঘোড়াপাখিয়া ইউপির কোথনিপাড়ার জিহাদ আলী (১৭) নিহত হন। আহত হন সদর উপজেলার মো. শুভ (২২), চরবাগডাঙ্গা গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন (৩০) ও বজলুর রহমান (২০)। এর মধ্যে বজলু হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এবং শুভ ও মিনহাজ ২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধী রয়েছেন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে হাতবোমা তৈরির উপকরণ, বিস্ফোরক দ্রব্য ও সরঞ্জামাদি উদ্ধার ও তদন্তের ঘটনায় উঠে এসেছে দুবাইয়ে পলাতক শাহীদ রানা টিপু ওরফে ‘ইয়াবা টিপু’র নাম। এই আওয়ামীলীগ নেতা জুলাই আন্দোলনের পর থেকে দুবাইয়ে পলাতক রয়েছেন। নিহত অপর দুই ব্যাক্তিও সরাসরি আ’লীগের রাজনীতি সাথে জড়িত।

বিস্ফোরণের পরে শাহীদ রানা টিপু ওরফে ‘ইয়াবা টিপু’কে প্রধান আসামি সদর মডেল থানায় এসআই বেলাল হোসেন বাদি হয়ে বিস্ফোরক আইনে মামলা করেন। এজাহারে উল্লেখ করা হয় টিপুর আর্থিক সহযোগিতায় ও নির্দেশে বোমা তৈরি করা হয়। এতে ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আট থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে রামেক কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত তিন জন রয়েছেন। পরে চরবাগডাঙ্গা ফাটাপাড়া গ্রামের চান মোহাম্মদের ছেলে মো. ইউসুফ (৪৫) ও গাঠাপাড়া গ্রামের ফজর আলীর ছেলে মো.শাকিল (৩৭) কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা আ’লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এদিকে ঘটনার সাথে অভিযুক্ত শরীফ উদ্দীন দুলালও সর্বশেষ জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতা দুলাল প্রতিপক্ষ গ্রুপের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুক্রবার রাতে চরবাগডাঙ্গা মেডিকেল মোড়ে দুলালের নেতৃত্বে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনার করা হয়। ফুটেজের কথোপকথনে দুলালের গ্রুপের আবদুল মালেককে বলতে শোনা যায়, ‘প্রতিপক্ষ জুয়েল মেম্বারকে শেষ কর দিলেই রাস্তা ক্লিয়ার।’ শুক্রবার গভীর রাতে শরীফ উদ্দীন দুলালের ভাই কালামের বাড়িতে হাতবোমা তৈরি করা হচ্ছিল। যা একপর্যায়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘরের টিন ও দেয়াল ধসে যায়। বোমা তৈরির কারিগর আল আমিন ও জিহাদ ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। আহত তিনজনকে প্রথমে নবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল ও পরে রামেক হাসপাতালে নেয়া হয়।

স্থানীয়রা জানায়, যে বাড়িতে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেই বাড়ির মালিক কালাম কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ’লীগের স্থানীয় নেতা মো. দুলালের ভাই। তিনি চরবাগডাঙ্গা ইউপির বরখাস্তকৃত চেয়ারম্যান শহীদ রানা ওরফে টিপুর ঘনিষ্ঠ লোক। আর টিপুর নামে চারটি হত্যা মামলা রয়েছে। টিপু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী এবং তার পুরো পরিবার আ’লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাবা আবু বাক্কার ঝাটু ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তবে দলে টিপুর কোনো পদ নেই। তারপরও তিনি আওয়ামী লীগের আমলে দলটির নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। এলাকার তৎকালীন এমপি আব্দুল ওদুদের সঙ্গে ছিল সুসম্পর্ক। আওয়ামী সরকারের পতনের পর তিনি দুবাই পালিয়েছেন।

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বিএনপির সাবেক এমপি ও পরাজিত প্রার্থী হারুনুর রশিদ। তিনি এই ঘটনার জন্য সরাসরি জামায়াতকে দায়ি করে বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করতেই আওয়ামী লীগ ও জামায়াত মিলে এই বোমা তৈরি করছিলো। তিনি সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, ভোটের দিন রাতে জামায়াতের মিছিল থেকে বিএনপির নাসির মেম্বারসহ কয়েজনের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। পুলিশের উদ্যোগে ঘটনার মীমাংসা হলেও এলাকায় ত্রাস সৃষ্টির জন্য পলাতক চেয়ারম্যান টিপুর (শহীদ রানা) অর্থায়নে এসব বোমা বানানো হচ্ছিল। এসব ঘটনায় আ’লীগ ও জামায়তের লোকজন জড়িত। ঘটনায় যেই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার। অপর দিকে বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিএনপি নেতা হারুনর রশীদের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান জামায়াত নেতা লতিফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘তাঁর মতো (হারুনর রশীদ) দায়িত্বশীল মানুষের এমন বক্তব্য আশা করি না। এটা কোনো রাজনৈতিক ঘটনা (বিস্ফোরণে হতাহত) নয়। জামায়াতের লোকজনকে দায়ী করা ঠিক নয়। ধানের শীষের লোকজনের ওপর দাঁড়িপাল্লার লোকজন হামলা করেছে, এটাও ঠিক নয়।’ তিনি জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করার চেষ্টা করলেও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র, মামলার এজাহার ও পুলিশের বক্তব্যে এখন পর্যন্ত দল হিসেবে জামায়াতের সম্পৃক্ততার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়রা অধিবাসীরা জানান, সীমান্ত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণে এখানে আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপ সক্রিয়। একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলী। অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দেন সাবেক চেয়ারম্যান ইয়াবা টিপু। তার পক্ষে সবকিছু করছিলেন দুলাল। আর তাদের প্রতিপক্ষ গ্রুপের ওমর আলী ছিলেন বিএনপির প্রার্থী হারুনুর রশীদের পক্ষে। মূলত ওমর আলীর হাত থেকে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতেই বোমাসহ বিস্ফোরক মজুদ করেছিলেন তারা। এমনটা মনে করছে স্থানীয় বাসিন্দাগণ। সূত্র জানায়, বোমা বিস্ফোরণের রাতেও দুলাল তার অনুসারীদের নিয়ে নাশকতা পরিকল্পনা করেন। কটাপাড়া মেডিকেল মোড়ে শনিবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে রাস্তায় দাঁড়িয়েই প্রায় ১৪ জনের সঙ্গে আলোচনা করেন দুলাল। এসময় দুলাল ছাড়াও ইয়াবা টিপুর আপন ভাই শাহারুল আলম কালু, টিপুর চাচাত ভাই আব্দুল মালেক ও মুজিবুর রহমান উপস্থি ছিলেন। এসময় আধিপত্ব্য বিস্তার নিয়ে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জুয়েল রানাকে ‘সাইজ’ করার পরিকল্পনার কথা শোনা যায়।

এদিকে ঘটনার পর জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য, কাঁচামাল, ককটেল ও হাতবোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, হাতবোমা তৈরির রাসায়নিক উপাদান, কাঁচের বোতল, টেপ, লোহার টুকরা, বিস্ফোরক মিশ্রণের প্রস্তুতকৃত প্যাকেট, স্থানীয়ভাবে তৈরি ককটেল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা স্বীকার করেন প্রভাব বিস্তারসহ প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতেই এসব বিস্ফোরক প্রস্তুত করা হচ্ছিল। অপর দিকে পুলিশের সূত্র জানায়, অর্থের জোগান এসেছে বিদেশ থেকে। বিশেষ করে দুবাইয়ে অবস্থানরত স্থানীয় আওয়ামীলীগের এক প্রভাবশালী নেতার মাধ্যমে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, দুবাইয়ে পলাতক শাহীদ রানা টিপু দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা ও সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘ইয়াবা টিপু’ নামেই বেশি পরিচিত। ‘ইয়াবা টিপু’ এই অর্থের যোগান দিয়েছে বিকাশ এবং হুন্ডির মাধ্যমে। এই অর্থ দিয়েই বোমার সরঞ্জাম সংগ্রহ ও বোমা তৈরির কারিগত ঠিক করা হয়। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, শরীফ উদ্দীন দুলাল পূর্বে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশের পট পরিবর্তে আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলী বিএনপিতে যোগ দিলে কোনঠাসা হয়ে পড়ার আশংকায় নিজেদের নিজেদের আধিপত্ব্য ও অস্তিত্ব ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ব্যক্তিগত প্রভাব ও সীমান্ত মাদক ও অর্থনীতিকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড ঘিরে। গ্রুপ গুলো চায় নিজ নিজ অধিপত্ব্য ধরে রাখতে। এর অংশ হিসেবে ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি ওমর আলী সাবেক এমপি হারুণের সাথে প্রকাশ্যে বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছে। বিএনপিকে ব্যবহার করে তিনি প্রতিপক্ষ গ্রুপের প্রভাব ক্ষুন্নসহ একছত্র প্রভাব রাখতে মরিয়া।

বিএনপির রাজনীতিতে সাবেক এমপি হারুণের ভূমিকা নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোঃ রফিকুল ইসলাম (চাইনিজ রফিক) বলেন, বিএনপি গত ১৭ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করার পরে নেতা-কর্মীরা আশা-আকাঙ্খা করেছিলো নেতৃত্বে নতুন মুখ আসবে। কারণ এরাতো আন্দোলন সংগ্রামে ছিলোনা। কিন্তু হাই কমান্ড দলীয় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা মেনে জেলা বিএনপি ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের মধ্যে এমপি ক্যান্ডিডেট গুলো জেলা, থানা, পৌর, ওয়ার্ড বিএনপির কাউকে সাথে না নিয়ে ভোট করা শুরু করলো। তারা ফ্যাসিষ্টের সময় আওয়ামীলীগের সময় যারা বিভিন্ন দুর্বিত্তায়নের সাথে মাদকের সাথে জড়িত ছিলো, যারা আওয়ামীলীগের সময় সুবিধাভোগী ছিলো তাদের পাশে বসিয়ে নিয়ে ভোট শুরু করলো। এখানে যেমন বিএনপির নেতা কর্মীরা অনেক কষ্ট পেয়েছে। অথচ যে আওয়অমীলীগ গত ১৭ বছর জ্বালিয়েছে, পুড়িয়েছে, আমরা যাদের জন্য ঘরছাড়া হয়েছি, বাড়ি ছাড়া হয়েছি, গুমের শিকার খুনের শিকার হয়েছি, তারাই এমপি ক্যান্ডিডেটের পাশে বসে নির্বাচন করেছে। তিনি এক ভিডিও বার্তায় সাবেক এমপি হারুণ কে নিয়ে বলেন, নেতা হচ্ছে প্রধান অতিথী, নেতার ওয়াইফ হচ্ছে প্রধান বক্তা, নেতার ছেলে হচ্ছে, বিশেষ বক্তা। নেতা তো তিন মা-বেটা। আ’লীগের লোকজনকে পুলিশ যদি গ্রেফতার করে তবে থানা ঘেরাও করবে এটা প্রকাশ্যে বলছে। আ’লীগের লোকজন যদি দুর্বিত্তায়ন হয়, কোরো ক্ষতি করে থাকে, কাউকে খুন করে থাকে, জমি দখল করে থাকে মানুষ তো অবশ্যই এর প্রতিকার চাই। আ’লীগের লোকজন তে ধরতে গেলে সে থানা ঘেরাও করবে। তার পাশে মাদক ব্যবসায়ী যাবতজ্জীবন জেলের আসামী তার পাশে থাকে। তার ডান পাশে আওয়ামীলীগের সভাপতি থাকে।’’

চরবাগডাঙ্গা সীমান্তবর্তী এলাকা হবার কারণে এখানে দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালান, মাদক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দাপট রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকা হবায় দরুন আইন প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়ে, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় জড়ায়। এতে তরুণদের ব্যবহার করে ‘কন্ট্রাক্ট ভায়োলেন্স’ তৈরি করা হয়। আর এই প্রেক্ষাপটে বিস্ফোরক তৈরির ঘটনা বৃহত্তর রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিতও বহন করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এঅঞ্চলে রাজনৈতিক উত্তেজনা আগে থেকেই ছিল। ফলে একটি দল স্থানীয়ভাবে প্রভাব ধরে রাখতে বিরোধীদের দমাতে সহিংস প্রস্তুতি চালিছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো, এই ঘটনায় যদি দলীয় সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তবে তা আ’লীগের স্থানীয় সাংগঠনিক অবস্থানে বড় ধাক্কা লাগবে পাশাপাশি জামায়াতের উপর দোষ চাপানো সহজ হবে। আবার জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হলে আ’লীগের উপর ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত মামলা’ বলেও প্রচার সহজ হবে। মধ্যে থেকে লাভবান হবে স্থানীয় বিএনপি। এদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়েছে, যেহুতু দুবাই ভিত্তিক লেনদেনের সংশ্লিষ্টতা উঠে এসেছে তাই ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারিসহ মানি লন্ডারিং আইনে পৃথক মামলার দাবী জানান।

বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ওবায়েদ পাঠান সাবেক এমপি হারুণের দেয়া বক্তব্যে প্রতিবাদে জানিয়ে বলেন, হারুণ সাহেব যেভাবে আক্রোশমূলক কথা বলছেন, সেটা মোটেও শোভনীয় নয়। উনি কি পরাজিত হবার পরে উনার মাথায় কি কোন সমস্যা হয়েছে নাকি। তিনি যে লোকটিতে সেফ জোন করার জন্য বলছেন উনি উমর সাহেব আওয়ামীলীগের সভাপতি এবং ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। আমি পুলিশ প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষন করবো কামাল এবং দুলাল সাহেবের বাসায় যে ঘটনা ঘটেছে যারা জীবিত আছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে যারা এবিষয়ে জড়িত আছেন তাদের শাস্তিÍর আওতায় নিয়ে আসেন। আমাদের বিএনপি নেতা-কর্মী কিংবা সাধারণ জনগন যাতে কোন মতেই এব্যাপারে সংযুক্ত না হয়। তিনি আরও বলেন, এই ঘটনার সাথে বিএনপি বা জামায়াত কেহই জড়িত নয়।ভিলেজ পলেটিক্স এর কারণে নেতা এমন বক্তব্য দিচ্ছেন। যারা মারা গেছে তারা এবং ওমর চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগের সাথে জড়িত। আর এঘটনার সাথে যিনি বা যেই সম্পৃক্ত হয়েছেন তারা মাদকের ভাগ খাওয়ার জন্য। আর আওয়ামীলীগের কারণে এখানে দলের ভারসম্য নষ্ট হয়ে গেছে। তিনটি সিটে পরাজিত হওয়ার অন্যতম এটা একটা কারণ।

সাবেক এমপি হারুণের অভিযোগের বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির আবু জার গিফারী বলেন, ‘এ ঘটনায় জামায়াতের জড়িত থাকার প্রশ্নই ওঠে না। “এ ধরনের সহিংস রাজনীতি আমাদের নীতির পরিপন্থী। এ ধরনের রাজনীতি আমরা কখনও করিনি। নির্বাচনে ভালোবেসে অনেকেই আমাদের ভোট দিয়েছে। আ’লীগের প্রার্থী নেই বলে অনেকে আমাদের পক্ষে ভোট দিয়েছে আবার বিএনপিকেও দিয়েছে।’ ঘটনার পর ডিআইজি, এসপি, ডিসি সাহেব ছিলেন। আমরা দলের পক্ষ থেকে বলেছি, কোনো নির্দোষ-নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হয়। প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, চরবাগডাঙ্গায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি সীমান্ত ভিত্তিক রাজনীতি, মাদক অর্থনীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জটিল সমীকরণের অংশ। গ্রুপ দ্বন্দ্ব থেকে নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনা রুপ নেয়। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্ত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামীলীগের রাজনীতির ভেতরে বিভক্তি ছিল। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি, অন্য গ্রুপের নেতৃত্বে সাবেক চেয়ারম্যান টিপু। এসময় টিপু-সমর্থিত অংশটি সীমান্তকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালী ছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। দেখা গেছে, ইউনিয়ন আ’লীগ সভাপতি ওমর আলী সাবেক এমপি হারুণের সাথে প্রকাশ্যে বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছে। তিনি বিএনপিকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ গ্রুপের প্রভাব ক্ষুন্নসহ একছত্র প্রভাব রাখতে মরিয়া। এদিকে বোমা বিস্ফোরণের মামলায় টিপু প্রধান আসামি হওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী রাজনীতিতে তার প্রভাব ফিরে আসছে। আবার জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে জামায়াতের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন এবং প্রমাণ ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরির একটি ইস্যু হয়েছে। পাশাপাশি হারুণের অভিযোগ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার আশঙ্কা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল জেলাবাসীর সামনে উপস্থিত করার সহজ পন্থা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও স্থানীয় আধিপত্যের লড়াইকে দলীয় রঙ দেয়ায় প্রকৃত তদন্তকে জটিল করে তোলার একটি অপকৌশলমাত্র।



বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top