৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করে বিপাকে
এডিসি মাহমুদা বেগম কে রাখতে পারলেন না ভূমিমন্ত্রী মিনু
রাজ টাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬ ১১:৩৭; আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ১১:৪৪
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করে স্বস্তিতে নেই নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগম। সরকারি টাকা লুটপাটের ক্ষেত্র বন্ধ করে এখন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের টার্গেট হয়েছেন তিনি। ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ফোন করে তাকে সরিয়ে দেওয়ার আদেশ স্থগিত করেন। কিন্তু এরপর তাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে। প্রভাবশালী একটি চক্র তাকে সরিয়ে দিয়ে ভূমি অধিগ্রহণের এই খাত থেকে বড় অঙ্কের টাকা লুটপাটের পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পিত কমিশন লুটপাটের মিশনে বাধা দেওয়ায় এডিসিকে সরিয়ে দেওয়ার মিশনে নেমেছে প্রভাবশালী চক্রটি।
সূত্র: যুগান্তর।
এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুধবার রাতে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু যুগান্তরকে বলেন, ‘এমন তো হওয়ার কথা না। এই সাহসী অফিসারকে প্রটেকশন দেওয়ার জন্য তিনি ইতোমধ্যে কিছু নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলেন। এছাড়া বিষয়টি জানার পর খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাকে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেওয়াসহ মনিটরিং করছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ভূমি মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার বাজেট পেশ হবে। এজন্য ব্যস্ত থাকবেন। রোববার তিনি এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
জানা যায়, গত ২৫ দিনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মাহমুদা বেগমকে ৩ বার বদলি করেছে। বারবার তাকে বদলির পেছনে ইন্ধন দিচ্ছেন উপসচিব মো. মোস্তফা মনোয়ার। তিনি বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে কর্মরত। ৩০ বিসিএসের এই কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ২১ মার্চ থেকে ৯ জুন পর্যন্ত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হিসাবে নরসিংদীতে দায়িত্ব পালন করেন। এডিসি হিসাবে আড়াই মাস দায়িত্বে থেকে এই কর্মকর্তা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে ৩৫৯ কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কমিশন নিয়ে গেছেন। এ সংক্রান্ত কিছু অডিও-ভিডিও যুগান্তরের কাছে সংরক্ষিত। গুরুত্বপূর্ণ ৩টি এলএ কেসের অ্যাওয়ার্ড বই (ক্ষতিপূরণ নির্ধারণী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত) মো. মোস্তফা মনোয়ার প্রস্তুত করেন। এরমধ্যে ১৫নং এলএ কেসের ২৪০ কোটি, ১৪নং এলএ কেসের ৪৮ কোটি এবং ১০নং এলএ কেসে ৭১ কোটিসহ মোট ৩৫৯ কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করেন। এসব এলএ কেসে জমি অধিগ্রহণ আইন ও নিয়মনীতি কোনোটাই অনুসরণ করা হয়নি। ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে তদন্ত করছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এ অবস্থায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ অধিগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র (ফিল্ডবই ও জমির আগের অবস্থানসংক্রান্ত ভিডিও) সরিয়ে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে উপসচিব মো. মোস্তফা মনোয়ার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ সঠিক নয়। সব সময় নিয়ম মেনে কাজ করেছি। কেউ কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবে না।’ অধিগ্রহণের বিল পরিশোধের বিপরীতে কমিশন নেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ যুগান্তরের কাছে রয়েছে-এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।’
প্রসঙ্গত, গত ২৮ এপ্রিল ‘জমি অধিগ্রহণে ডিসির নেতৃত্বে বিস্ময়কর কাণ্ড, স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ঘুস ভাগাভাগি শিরোনামে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তরের পলিটিক্যাল প্রভাবশালী একজন কর্মকর্তা বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণের বিল পরিশোধের জোরালো তদবির করেন। তার তদবিরটি ছিল নীতিমালাবহির্ভূত। নিয়ম লঙ্ঘন করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলে আরও দিতে হবে বিবেচনায় নিয়ে ওই কর্মকর্তাকে সরাসরি ‘না’ বলে দেন মাহমুদা বেগম। এরপর প্রভাবশালী ওই ব্যক্তি তাকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনার ক্ষমতা বেশি না আমার ক্ষমতা বেশি দেখতে পাবেন।’ পরদিন ২৭ এপ্রিল তাকে পরিকল্পনা বিভাগে সিনিয়র সহকারী প্রধান হিসাবে বদলি করা হয়। ২৮ এপ্রিল যুগান্তরে প্রতিবেদন দেখে ওইদিনই ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ফোন করে এডিসি মাহমুদার বদলি স্থগিত করতে বলেন। একই সঙ্গে মাহমুদা বেগমকে ফোন করে সরকারের অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করায় ধন্যবাদ জানান এবং নির্ভয়ে কাজ করতে উৎসাহ দেন। এর ১৫ দিনের মাথায় ১৩ মে তাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব পদে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর আগে ১৯ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে বদলি করা হয় মাহমুদাকে।
নরসিংদী জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মাহমুদা বেগম নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পদে যোগ দেন। এই পদে যোগ দিতে অন্য সহকর্মীদের রীতিমতো প্রতিযোগিতা ছিল। কারণ চলমান জমি অধিগ্রহণের দালাল সিন্ডিকেট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ এই টেবিল থেকেই করা হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক রাশেদ হোসেন চৌধুরী নরসিংদীতে তার শেষ কর্মদিবসের দিন মাহমুদা বেগমকে এডিসি (রাজস্ব) পদে নিয়োজিত করে যান। এরপর চলমান জমি অধিগ্রহণে দালাল সিন্ডিকেটের দুর্গ ভেঙে নীতিমালার বাইরে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না বলে তিনি ঘোষণা দেন। এরপর একে একে বিভিন্ন এলএ কেসের শুনানি নিয়ে অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করেন। এছাড়া নীতিবহির্ভূত আবেদন বাতিল করে দেন। জেলার সাবেক ডিসি-এডিসি এবং অধিগ্রহণ কর্মকর্তারা আইন-নীতিমালা লঙ্ঘন করে ক্ষতিপূরণের তালিকা করে রেখেছিলেন।
২৪ দিনে ৩ বার বদলি
সূত্র: যুগান্তর (নেসারুল হক খোকন)
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম, প্রিন্ট সংস্করণ।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: