ফিরে দেখা জুলাই ৩৬ ॥ স্তব্ধ আর অবরুদ্ধ দুর্গে পরিণত রাবি

চিরুনি অভিযান, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন, গণগ্রেপ্তারে আতঙ্কিত নগরী

শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০২৬ ১৫:৪০; আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ ১৫:৫২

ফাইল ছবি

জুলাই গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে ২০২৪ সালের ১৭ থেকে ২৩ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও রাজশাহী নগরীর জন্য ছিল সবচেয়ে আতঙ্কময় দিনগুলোর অন্যতম একেকটি দিন।

সারা দেশে কারফিউ, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা, গণগ্রেপ্তার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযানের মধ্যেই রাবিতে সৃষ্টি হয় ভীতিকর পরিস্থিতি। ১৭ ও ১৮ জুলাই পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নজিরবিহীন হামলা এবং হল ছাড়ার নির্দেশের পর এই দুদিনে ক্যাম্পাসের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ নগরীর মেহেরচণ্ডী, বিনোদপুর, কাজলা, ভদ্রা, তালাইমারী, শালবাগান, লক্ষ্মীপুর, উপশহর ও কোর্ট এলাকার বিভিন্ন ছাত্রমেসে বসবাস করতেন। আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে এসব এলাকায় অভিযান চালানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেক শিক্ষার্থী রাতের মধ্যেই মেস ছেড়ে আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষকদের বাসা কিংবা পরিচিতজনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। কেউ কেউ নিরাপত্তার জন্য বাসার ছাদে, আবার কেউ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অবস্থান পরিবর্তন করে রাত কাটান।

২০২৪ সালের ২২-২৩ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও রুয়েট ক্যাম্পাস এবং সংলগ্ন এলাকাগুলোর পরিস্থিতি ছিল থমথমে জনশূন্য এবং তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কে ঘেরা। মূলত ১৭ ও ১৮ জুলাই পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নজিরবিহীন হামলা চালায়।

পরে জোরপূর্বক হল খালি ও ক্যাম্পাস জনশূন্য হওয়া ১৭ ও ১৮ জুলাই প্রশাসনের নির্দেশে আবাসিক হলগুলো কার্যত খালি করে দেয়া হয়। ২২-২৩ জুলাইয়ের মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হন। তবে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট (যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা) এবং তীব্র পরিবহন সংকটের কারণে অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা দূর-দূরান্তে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে না পেরে চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন।

এর আগে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৬ জুলাই রাবি ছিল দেশের অন্যতম আলোচিত ক্যাম্পাস। ওইদিন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভাঙচুর এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করেন। ১৬ জুলাইয়ের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্যাম্পাস কার্যত অচল হয়ে যায়।

১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে দেশজুড়ে কারফিউ জারি হলে রাজশাহীও এক ধরনের অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়। ২২ জুলাই ছিল সেই কারফিউর তৃতীয় দিন। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হলেও দিনের বাকি সময়জুড়ে নগরীতে ছিল থমথমে পরিবেশ। একই সঙ্গে পঞ্চম দিনের মতো বন্ধ ছিল মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড সংযোগ। ফলে গুজব, অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্ক আরও বাড়তে থাকে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর ২২ জুলাই থেকে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওইদিন সারাদেশে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ প্রায় এক হাজার ২’শ জনকে গ্রেপ্তার করে। রাজধানী ঢাকায় মাত্র ছয় ঘণ্টায় আটক হন ৫১৬ জন। ১৭ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ছয় দিনে সারা দেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যায়। একই দিনে সংঘর্ষ ও নাশকতার ঘটনায় ১৬৪টি মামলা দায়ের করা হয়। র‌্যাব পৃথক অভিযান চালিয়ে আরও ৪০ জনকে আটক করে।

জাতীয় এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ে রাজশাহীতে। কারণ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থী এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), রাজশাহী কলেজ, নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ, সরকারি সিটি কলেজসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজারো শিক্ষার্থী নগরীর মেস ও ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। বিশেষ করে রাবিকে কেন্দ্র করে মেহেরচণ্ডী, বিনোদপুর ও কাজলা এলাকাগুলো আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের প্রধান অবস্থানস্থলে পরিণত হয়েছিল।

১৮ জুলাই ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের অভিযান-গুলিবর্ষণঃ এদিন আন্দোলন দমাতে তৎকালীন স্থানীয় ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন ছাত্রাবাসে অভিযান চালায় এবং ব্যাপক টিয়ারগ্যাস ও গুলিবর্ষণ করে। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন।

রেল যোগাযোগ অবরোধ: ২১ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে ট্রেনে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এর জেরে ২২ জুলাই সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা সংলগ্ন রেললাইন অবরোধ করেন। ফলে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বনলতা, সিল্কসিটি ও ধূমকেতু এক্সপ্রেসসহ সব আন্তঃনগর ট্রেনের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে ২৩ জুলাই পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো রাজশাহীতেও ২২-২৩ জুলাই রাজপথে নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে পড়েন এবং সরকারবিরোধী স্লোগানে পুরো শহর উত্তাল করে তোলেন। এদিকে ২২ জুলাই সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর টহল জোরদার হয়। মেসে মেসে পরিচয় যাচাই, কক্ষ তল্লাশি এবং শিক্ষার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ থাকলেও এসএমএস, ফোনকল ও মুখে মুখে এসব তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। ফলে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কও বাড়তে থাকে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা এক সাক্ষাতকারে বলেন, “২২ জুলাই রাতে মেহেরচণ্ডী এলাকায় তল্লাশির খবর ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, তাদের অবস্থানেও অভিযান হতে পারে। ফলে সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে শুরু করেন। সেই রাতে আমিও এক ভাইয়ের মেসে আশ্রয় নিয়েছিলাম। পরে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় সেখান থেকেও সরে যেতে হয়। তখন রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল জীবন রক্ষা।”

এসময় আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা কেহউ নিজের মেসে নিরাপদ বোধ করেননি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও মোবাইল নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়েছিলাম। কেউ আত্মীয়ের বাসায়, কেউ বন্ধুর বাসায়, আবার কেউ সারারাত অবস্থান পরিবর্তন করেছি। পুরো রাতটাই কেটেছে গ্রেপ্তারের আতঙ্কে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ জুলাইয়ের রাজশাহী ছিল এক ভিন্ন নগরী। নগরীর প্রধান সড়কগুলো ছিল প্রায় ফাঁকা। সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, শিরোইল, রেলগেট, কোর্ট এলাকা ও তালাইমারী মোড়ে যানবাহন ছিল সীমিত। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে উদ্বেগ। বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের খোঁজ নিতে নগরীতে আসেন। অনেক বাড়ির মালিকও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ১৬ জুলাইয়ের সংঘর্ষ, ১৯ জুলাইয়ের কারফিউ এবং ২২ জুলাইয়ের চিরুনি অভিযান এই তিনটি ঘটনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থীদের কাছে ২২ জুলাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি এমন এক রাত, যখন নিজের মেসও নিরাপদ মনে হয়নি, যখন দরজায় কড়া নাড়ার শব্দও আতঙ্ক তৈরি করেছিল, আর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে বেড়াতে হয়েছিল শত শত শিক্ষার্থীকে।

দুই বছর পরও ২২ জুলাইয়ের সেই দীর্ঘ রাত রাজশাহীর শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে অমলিন। তাদের ভাষায়, এটি ছিল ভয়ের, অনিশ্চয়তার, গুজবের এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে এক প্রজন্মের কঠিন পরীক্ষার রাত।



বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top