নিরাপত্তায় ১৬ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য
রাজশাহীর ৭৭৮ কেন্দ্রে ভোট দেবেন ২৩ লাখ ভোটার
শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:৩১; আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:২৮
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়সহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ভোটের আগের দিন থেকেই পুরো জেলায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে ৭৭৮ টি কেন্দ্রে প্রায় ২৩ লাখ ভোটার ভোটাধীকার প্রয়োগ করবেন। আর ছয়টি আসনে মোট ১৬ হাজার ১১৩ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই দিনে রাজশাহীর ছয়টি আসনে উপজেলা পর্যায়ে ভোটগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সব নির্বাচনী সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে এসব উপকরণ নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু হয়। প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব সরঞ্জাম হস্তান্তর চলমান রয়েছে।
জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাজশাহীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও প্রবেশপথগুলোতে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। পাশাপাশি শহর এবং গ্রামাঞ্চলে টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচন উপলক্ষে রাজশাহীর ছয়টি আসনে মোট ১৬ হাজার ১১৩ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশ ৩ হাজার ৯৮২ জন, বিজিবি ৭৬০ জন, র্যাব ১৪৭ জন, সেনাবাহিনী ১ হাজার ১১০ জন, আনসার ও ভিডিপি ১০ হাজার ১১৪ জন।
অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার জিয়াউল হক খান জানান, নির্বাচন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।” অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, “নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে।” জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার জানান, সীমান্তবর্তী তিনটি উপজেলায় অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন থাকবে। তিনি বলেন, “ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।”
নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৭৭৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এসব কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ২২ লাখ ৯১ হাজার ২০১ জন। এ নির্বাচনে ছয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩১ জন প্রার্থী। তবে প্রতিটি আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির মধ্যে।
রাজশাহী-১: আসনটি রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা নিয়ে গঠিত। কৃষিপ্রধান এলাকা ও গ্রামীণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত ১২টি নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামীলীগের প্রার্থীরা পাঁচ বার করে ১০ বার এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একবার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার বিজয়ী হন। আর ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হন। এখানে ২০১৮ সালে মোট ভোটার সংখ্যা ছিলো ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩৫২, ২০২৩-২৪ সালে ৪ লাখ ৪০ হাজার ২১৮ জন এবং এবার বৃদ্ধি পেয়ে ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬২ জন। যা বছরের তুলনায় ২৮ হাজার ১শ ৪৪ ভোটার বৃদ্ধি হয়েছে। এক হিসেবে দেখা যায় নতুন ভোটার সংখ্যা ২৮ হাজারের অধীক। এই নতুন এবং তরুণ ভোটারা আগামী নির্বাচনে যথেষ্ট প্রভাব রাখবে বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রাপ্ত তথ্য উপাত্বে উঠে এসেছে।
রাজশাহী-২ (সদর): এখানে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু ও তার বিপক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সংগঠনের শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো, নিয়মিত দাওয়াতি কার্যক্রম এবং নগরভিত্তিক ভোট ব্যাংকের ওপর ভর করে জামায়াত এই আসনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৩ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১লাখ ৭১ হাজার ৪১৮ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৫৯ জন। তৃতীয় লিঙ্গ (হিজড়া) ভোটার রয়েছেন ৮ জন। আর ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১১৫টি। আর তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যায়, ১৯৯০ দশকে ও প্রথম থেকেই এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী শক্তপোক্ত প্রভাব রাখে। পরবর্তী পর্যায়ে আওয়ামী লীগ এখানে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও বিতর্কিত নির্বাচনে প্রকৃত হিসেব থেকে তারা ছিটকে পড়ে। এদিকে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কবির হোসেন ভোট পান শতকরা ৪৩ দশমিক ৪০ এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আতাউর রহমান ভোট পান শতকরা ২১ দশমিক ৫০ ভাগ। পরবর্তী ২০০১ সালে এক লাখ ৭৬ হাজার ৪০৫ ভোট পান মিনু। এসময় তার পক্ষে জামায়াত সমর্থনসহ সার্বিক নির্বাচনী প্রচারণা চালান।
রাজশাহী-৩: আসনটি ২০০৮ সালে সিটি করর্পোরেশনের উপকণ্ঠ পবা ও মোহনপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। এখানে ভোটার ৪ লাখ ১৬ হাজার ৯’শ ৯জন। এরমধ্যে পুরুষ দু’লাখ ৭ হাজার ৮০, মহিলা দু’লাখ ৯ হাজার ৮’শ ২৪ ও থার্ড জেন্ডার ৫ জন। বিগত ১২টি নির্বাচনের বিতর্কিত ৬টি নির্বাচনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এছাড়া বিএনপি চার বার এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী দু’বার নির্বাচিত হন। তবে এইবারের চিত্র ভিন্ন। বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন। আর জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়র পেয়েছেন বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ ও বেলপুকুর আইডিয়াল কলেজের সাবেক সহকারি অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। ধারণা করা হচ্ছে জামায়অত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বিজয় লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। রাজশাহীর আলোচিত সংসদীয় আসন
রাজশাহী-৪: এক সময় ‘রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত বাগমারা আসনটি ২০০৮ সালে গঠিত হয়। উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌর এলাকা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৪। ভোটার সংখ্যা ৩ লক্ষ ৫৪ হাজার ৬ শ ৬৪। নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হচ্ছে বিএনপি প্রার্থী ডিএম জিয়াউর রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর ডাঃ আব্দুল বারী’র মধ্যে।
রাজশাহী-৫: পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৫। মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৩ জন। এই আসনে জামায়াতের অবস্থান বেশ শক্ত।
রাজশাহী-৬: আর সংসদীয় ছয়টি আসনের মধ্যে সীমান্তঘেঁষা এলাকা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৬। আসনটি তুলনামূলকভাবে শান্ত হিসেবে পরিচিত। এ আসনে অতীতে মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রাধান্য বিস্তার করে এসেছে। তবে জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখানে জামায়াতের প্রভাবও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে সাধারণত বিজয়ের ব্যবধান খুব বেশি নয়, ফলে সামান্য ভোট স্থানান্তরই ফলাফল বদলে দিতে পারে।
এদিকে রাজশাহীতে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত আসন ৩টি। এগুলোতেই বাড়তি নিরাপত্তা ও যৌথবাহিনীর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলো রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর), রাজশাহী-৪ (বাঘা-চারঘাট) ও রাজশাহী-৬ (বাগমারা) আসন। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোটারদের নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেরয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। যে কোনো অনিয়ম বা সমস্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়। সব প্রস্তুতি শেষে এখন রাজশাহীর ছয়টি আসন তাকিয়ে আছে ভোটের দিনের দিকে ভোটারদের রায়ে নির্ধারিত হবেন আগামী সংসদের জনপ্রতিনিধি।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: