বিশ্বকাপ শেষ, তবে স্মৃতির খাতায় রয়ে যাবে রাতজাগা আড্ডা

রাবি প্রতিনিধি: | প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০২৬ ১৮:৪৭; আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬ ০৭:৫৫

ছবি: সংগৃহীত

চার বছর ধরে প্রতীক্ষিত ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা শেষ হচ্ছে আজ রাতে। ট্রফি উঠবে কোনো এক দলের হাতে, বিজয়ের হাসি ফুটবে একদল সমর্থকের মুখে, অন্যদিকে কারও স্বপ্ন ভেঙে যাবে। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো কোনো দলের জয়-পরাজয় নয়; বরং একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য রাত, বন্ধুত্বের গল্প, তর্ক-বিতর্ক, খুনসুটি আর ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা উৎসবের আবহ।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাত নামলেই যেন বদলে যেত বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা পরিবেশ। হলের টিভি রুম, বিভাগের করিডোর, আবাসিক মেস কিংবা বড় পর্দার আয়োজন—যেখানেই খেলা, সেখানেই ভিড়। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে, হাতে পতাকা আর মুখে স্লোগান নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন শিক্ষার্থীরা। খেলা শেষে কেউ উল্লাসে মেতে উঠেছেন, কেউ আবার হতাশ মুখে ফিরেছেন নিজের কক্ষে। তবে জয়-পরাজয়ের বাইরেও ছিল বন্ধুত্বের এক অনন্য গল্প।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপ দেখেছেন অনেক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। পরিবারের সঙ্গে নয়, বন্ধুদের সঙ্গে মধ্যরাতের খেলা দেখা তাদের কাছে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। খেলা শুরুর আগেই সবাই মিলে চা-কফির আড্ডা, স্কোর নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী, শেষ বাঁশি বাজার পর জয়-পরাজয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা—সব মিলিয়ে তাদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়।

বিশ্বকাপ ঘিরে ক্যাম্পাসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, তবে তা সীমাবদ্ধ ছিল মাঠের খেলায়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ইংল্যান্ড কিংবা অন্য দলের সমর্থকদের মধ্যে তর্ক হয়েছে, বাজি ধরেছেন অনেকেই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়েছে মজার খুনসুটি। কিন্তু খেলা শেষ হতেই সবাই আবার এক টেবিলে বসে চা খেয়েছেন, ক্লাস করেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। ফুটবল তাদের বিভক্ত করেনি, বরং আরও কাছাকাছি এনেছে।

যেসব দলের সমর্থকেরা বিদায় নিয়েছেন, তাদের কাছে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে আগেই। তবু তারা খেলা দেখা বন্ধ করেননি।

বিশ্বকাপকে ঘিরে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজনও পেয়েছে ব্যাপক সাড়া। একই স্থানে বিভিন্ন বিভাগের শত শত শিক্ষার্থী একত্রে বসে খেলা উপভোগ করেছেন। নতুন পরিচয় হয়েছে, নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে এবারের বিশ্বকাপ।

ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনাল ম্যাচের মহারণকে ঘিরে উৎসবের আমেজে ভাসছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল ম্যাচ উপভোগ করতে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসের তিনটি স্থানে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখার আয়োজন করা হয়েছে। ফলে হাজারো শিক্ষার্থীর সম্মিলিত উল্লাসে আবারও মুখর হয়ে উঠবে পুরো ক্যাম্পাস।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে জোহা চত্ত্বর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসুর) উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেডিয়াম ও ছাত্রদলের উদ্যোগে রাবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলার দেখার আয়োজন করা হয়েছে।

শরীরচর্চা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং ব্রাজিল সমর্থক নোমান ইবনে শাহীন বলেন, “বন্ধুবান্ধব ও বড় ভাইদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে বড় পর্দায় বিশ্বকাপের খেলা দেখা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন দলের পতাকা, জার্সি এবং প্রতিটি ম্যাচকে ঘিরে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা ক্যাম্পাসে খেলা দেখার আনন্দকে আরও দ্বিগুণ করে দিয়েছে।”

প্রিয় দলের বিদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ফুটবল বিশ্বকাপ চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়। তাই প্রিয় দলের বিদায় অবশ্যই কষ্টের। তবে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময় এবং বিশ্বকাপের অন্যান্য ম্যাচ উপভোগ করার ফলে সেই হতাশা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। আমরা আশাবাদী, আমাদের দল ভবিষ্যতে আরও ভালো খেলবে এবং অবশ্যই শক্তভাবে ফিরে আসবে।”

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মাহিম বলেন, “আগে কখনো এত বড় পরিসরে একসঙ্গে বসে বিশ্বকাপ দেখিনি। শত শত মানুষের সঙ্গে একই মুহূর্তে চিৎকার, করতালি আর উচ্ছ্বাস—পুরো অভিজ্ঞতাটাই ছিল অসাধারণ। মনে হয়েছে, এটা শুধু একটি খেলা নয়; বরং পুরো ক্যাম্পাসের একটি মিলনমেলা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব বলেন, “পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বসে বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা উপভোগ করার স্বপ্ন অনেক আগে থেকেই ছিল। একজন নবীন শিক্ষার্থী হিসেবে প্রথম বর্ষেই ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপের এমন পরিবেশে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া সত্যিই আমার জন্য ছিল অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এই সুযোগ পেয়ে আমি ভীষণ আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।”

সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাসে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশির ব্যবস্থা থাকবে এবং শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড সঙ্গে নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করা হবে। বহিরাগতদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যাতে সবাই নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে খেলা উপভোগ করতে পারেন।”



বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top