তিস্তার মহাপ্লাবন ব্রহ্মপুত্রের নতুন প্রবাহ যমুনা

মাহবুব সিদ্দিকী | প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২১:১৫; আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২২:১৩

ব্রহ্মপুত্রের নতুন ধারা যমুনা
যমুনা নামে বাংলাদেশে ও পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিম বাংলা আসামসহ সর্বমোট নদী রয়েছে ৭ টি। আলোচ্য যমুনা নদীটি সবচেয়ে নবীন এবং সর্ববৃহৎ। এটি ব্রহ্মপুত্রের অন্যতম বৃহৎশাখা। অপর ৬ টি যমুনার মধ্যে যমুনা (পঞ্চগড়) নামক নদীটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি আন্ত:সীমান্ত নদী। যমুনা (পঞ্চগড়) ভারতের জলপাইগুড়ি জেলাধীন ভক্তিনগর থানা এলাকায় তিস্তা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে জলপাইগুড়ি সদর থানার শেষ সীমান্তগ্রাম সরদারপাড়া অতিক্রম করে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলাধীন চাকলাহাট ইউনিয়নের অন্তর্গত সিংরোড প্রধানপাড়া নামক গ্রামে প্রবেশ করেছে। এরপর ৮ কিলোমিটার বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে পুনরায় ভারতে প্রবেশ করেছে। ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার মধ্যে সামান্য পথ পরিক্রমার পর পুনরায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে কুরুম নদে পতিত হয়েছে। যমুনা (পঞ্চগড়) নদীটি বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে আন্ত: সীমান্ত নদী হয়েও যৌথ নদী কমিশনের তালিকা ভূক্ত হয়নি।
ছোট যমুনা নামে একটি নদী দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। দিনাজপুর জেলার ইছামতি নামের নদীটি পার্বতীপুর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়ন এলাকায় এসে ছোট যমুনা নাম ধারণ করেছে। দিনাজপুর জেলাধীন ফুলবাড়ী, বিরামপুর ও হাকিমপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অত:পর জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি ও জয়পুরহাট সদর উপজেলা এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নওগাঁ জেলায় প্রবেশ করেছে। নওগাঁ জেলার ধামইরহাট, পত্নীতলা, বদলগাছী, নওগাঁ সদর, রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নে আত্রাই নদীতে পতিত হয়েছে। ছোট যমুনার দৈর্ঘ্য ১৯৫ কিলোমিটার।
যমুনেশ্বরী নামে নীলফামারী জেলায় উৎপত্তি লাভ করেছে একটি নদী। উৎসমুখ নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলাধীন কেতকীবাড়ী ইউনিয়নের বিলাঞ্চল। উৎস মুখে নদীটি পানগা নামে পরিচিত। প্রবাহপথে ডোমার উপজেলার শেষাংশ থেকে জলঢাকা (নীলফামারী) উপজেলার শিমূলবাড়ী ইউনিয়ন পর্যন্ত নদীটি দেওনাই নামে পরিচিত। শিমূলবাড়ী থেকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি ইউনিয়ন পর্যন্ত এটি চাড়ালকাটা নদী নামে পরিচিত। এরপর সামান্য দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ উপজেলাধীন চাঁদখানা ইউনিয়ন এলাকায় এসে নদীটি যমুনেশ্বরী নাম ধারণ করেছে। যদিও নীলফামারী সদর উপজেলা এলাকায় নদীটি যমুনেশ্বরী নামেই পরিচিত। এরপর যমুনেশ্বরী রংপুর জেলার তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলা এলাকা অতিক্রম করে দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলাধীন মাহমুদপুর ইউনিয়নে করতোয়া (নীলফামারী) নদীতে পতিত হয়েছে। দেওনাই-চাড়ালকাটা-যমুনেশ্বরী নদীর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ১১৬ কিলোমিটার।
বাংলাদেশের চতুর্থ যমুনা নদীটি আসলে হিন্দু পুরাণে উলি¬খিত যুক্তবেণীর (যমুনা-সরস্বতী-গঙ্গাঁ) অন্যতম প্রধান প্রবাহ ভারতের উত্তরাঞ্চলের পৌরানিক নদী যমুনার সর্বনিম্ন ধারা। উত্তর ভারতের প্রাচীন শহর এলাহাবাদ (প্রয়োগ বা মহাভারতোক্ত বারনাবত) পর্যন্ত প্রবাহটি যুক্তবেণী (গঙ্গাঁ-যমুনা-সরস্বতীর সম্মিলিত ধারা) নামে পরিচিত। পশ্চিম বাংলার হুগলি জেলাধীন চুঁচুড়া মহকুমার অন্তর্গত ত্রিবেনি নামক হুগলী (ভাগীরথী) নদীর পশ্চিম তীরবর্তী প্রাচীন তীর্থ শহরে এসে তিনভাগে বিভক্ত হয়েছে। এখানে গঙ্গাঁ যুক্ত হয়ে তিনভাগে বিভক্ত। গঙ্গাঁ যুক্তবেণী নামে পরিচিতি পেয়ে তিনটি ধারায় তিনদিকে প্রবাহিত হয়েছে। একটি ধারা পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হয়ে সরস্বতী নাম ধারণ পূর্বক বাংলার প্রাচীন বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক শহর সপ্তগ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বর্তমানে এই প্রবাহটি বিলুপ্ত। মাঝের ধারাটি আদিগঙ্গাঁ হিসেবে পরিচিত। এই ধারাটি সোজা দক্ষিণাভিমুখী হয়ে কলকাতা শহর বিধৌত করে বঙ্গোঁপসাগরে চলে গেছে। তৃতীয় ধারাটির নাম যমুনা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীগন এই ধারাটিকেই শ্রীকৃষ্ণের মথুরা শহর কিংবা সম্রাট শাহজাহানের আগ্রা শহরের বিখ্যাত যমুনা নদীর ভাটির অংশ বলে বিশ্বাস করেন। ত্রিবেনী থেকে মুক্ত হয়ে যমুনা পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত ও বসিরহাট মহকুমার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইছামতি (সাতক্ষীরা) নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। বসিরহাট মহকুমাধীন হাসনাবাদ থানার অন্তর্গত টাকি নামক পৌরশহর এবং বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলাধীন দেবহাটা উপজেলার টাউনশ্রীপুর নামক পৌরশহরের মাঝ দিয়ে ইছামতি নদী বা যমুনা নদী দক্ষিণমুখী প্রবাহ পথে অগ্রসর হয়েছে। প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে চলার পর দেবহাটা শহরটিকে পূর্বপাড়ে রেখে আরও কিছুটা পথ দক্ষিণে এসে পুনরায় সামান্য পশ্চিমমুখী হয়ে বসিরহাট মহকুমাধীন হাসনাবাদ থানা শহরে প্রবেশ করেছে। এখান থেকে যমুনা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বসন্তপুর (প্রতাপাদিত্যের পিতৃব্য বসন্তরায়ের গড়া শহর) নামক প্রাচীন জনপদে পৌছে গেছে।এখান থেকে যমুনা দক্ষিণ-পূর্বমুখী হয়ে ভারতের সীমানা অতিক্রম করে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলাধীন কালীগঞ্জ উপজেলা এলাকায় প্রবেশ করেছে। এর পূর্বে বসন্তপুরে যমুনা থেকে কালিন্দী নামে একটি শাখা নদীর জন্ম হয়েছে। কালিন্দী দক্ষিণে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে আরও ভাটিতে গিয়ে রায়মঙ্গঁল নদের সাথে মিশে গেছে। যমুনা কালীগঞ্জ শহর অতিক্রম করে দক্ষিণের শ্যামনগর এবং প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ধুমঘাট নামক স্থানের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর বংশীপুর নামক স্থানে এসে দুইটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে। মূল ধারাটি যমুনা নামে দক্ষিণ-পশ্চিম মুখী অবস্থায় রমজান নগর নামক জনপদের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছে। এরপর সোজা আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে রায়মঙ্গঁল নদের সাথে মিশে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত রচনা করেছে। এভাবে আরও অনেকটা পথ সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রায়মঙ্গঁল মোহনা দিয়ে বঙ্গোঁপসাগরে পতিত হয়েছে।
যমুনা নামের পঞ্চম প্রবাহটির অবস্থান ভারতের পশ্চিমবাংলা রাজ্যের বীরভূম জেলার রামপুরহাট মহকুমাধীন বীরচন্দ্রপুর নামক গ্রামে। এখানকার যমুনা দ্বারকা নদীর একটি শাখা।
যমুনা নামের আরেকটি নদী রয়েছে ভারতের আসাম রাজ্যের নওগাঁ জেলায়। যমুনা নামের এই নদীটি উৎপত্তি লাভ করেছে নাগাপাহাড় থেকে। যমুনা নদীটি আসাম রাজ্যের নওগাঁ জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া কাপিলী (ব্রহ্মপুত্রের উপ-নদী) নদীর অন্যতম প্রধান উপনদী।
বাংলাদেশে বিশাল জলাভূমি বা নদ-নদীকে রূপকার্থে যমুনা নামে আখ্যায়িত করা হয়। আমাদের দেশের কবি সাহিত্যিকগন বিশেষ করে লোক সাহিত্যে এজাতীয় উদাহরণ রয়েছে অসংখ্য। আলোচ্য যমুনা নামে পরিচিত ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদীটির আবির্ভাব ১৭৮৭ খ্রিষ্টব্দের পর থেকে। এদিক বিবেচনা করে নির্দ্বিধায় বলা যায় যমুনা নদীটি একেবারেই নবীন বা অর্বাচীন একটি প্রবাহ। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর মধ্যে বিশালত্বের দিক থেকে যমুনা নদীই এখন প্রধান। মূল ব্রহ্মপুত্র নদের অধিকাংশ পানি যমুনা বহন করছে।
যমুনা নদীর বিশালতা যাই হোকনা কেন প্রাচীন প্রবাহ ব্রহ্মপুত্র আপন মহিমায় এখনও উজ্জল। বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য অর্থনীতি, সংস্কৃতি বিশেষ করে লোকজ সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারায় ব্রহ্মপুত্র এখনও স্থায়ী আসনে সমাসীন। যদিও ব্রহ্মপুত্রের মূল স্রোত যমুনা দিয়েই প্রবাহিত এর পরেও কিন্তু এই নতুন ধারাটি ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত নয়। বাহাদুরাবাদ থেকে ময়মনসিংহ শহর হয়ে লাঙ্গঁলবন্ধ-সুবর্ণগ্রাম (সোনারগাঁ) এবং সবশেষে কলাগাছিয়া কিংবা বাহাদুরাবাদ থেকে বর্তমানকালের ভৈরববাজার পর্যন্ত যে প্রাচীন প্রবাহ এটি এখন অবধি মূল ব্রহ্মপুত্র হিসেবেই ভৌগলিকভাবে স্বীকৃত। তবে ভূগোলবিদগণ ব্রহ্মপুত্রের প্রাচীন এই প্রবাহটিকে বলছেন পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। তবেকি যমুনা নতুন ব্র্হ্মপুত্র হিসেবে স্বীকৃত ? মোটেই না। ব্রহ্মপুত্র এখন প্রায় স্রোতহীন। কিন্তু তাতে কি ! ব্রহ্মপুত্রের পরিপুরক কখনই যমুনা নয়। ব্রহ্মপুত্রের সাথে যমুনার কোন তুলনা চলেনা।
যমুনা নদীটির সৃষ্টি কখন কিভাবে ঘটেছে তথ্য প্রমান ভিত্তিক এই আলোচনা শুরুর পূর্বে ব্রহ্মপুত্রের বিশালত্ব নিয়ে সামান্য আলোচনা হতে পারে। সুবিশাল ব্রহ্মপুত্র বাংলায় মুসলিম শাসনামলের (এয়োদশ শতাব্দী) শুরুতে স্থান বিশেষে ৮ থেকে ১০ মাইল প্রশস্তা ছিল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দিন সিরাজ (কাযী মিনহাজ-ই-সিরাজ জোযজানী) কর্ত্তৃক রচিত ‘তবকাৎ-ই-নাশিরী’ নামক ভারতের ইতিহাসের আকর গ্রন্থে ( হিজরী ৬৫৮/১২৬০ খ্রিষ্টাব্দে রচিত) উলে¬খ করেছেন যে, সেকালে ব্রহ্মপুত্র গঙ্গাঁ নদীর চেয়ে তিনগুন প্রশস্তা ছিল। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে আবুল ফজল আল¬ামী কর্ত্তৃক রচিত আইন-ই-আকবরী নামক বিখ্যাত গ্রন্থে উলে¬খ রয়েছে, শেরপুর থেকে জামালপুর পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র ১০ মাইল প্রশস্তা ছিল। উক্ত দশ মাইল নৌপথ পারাপারের জন্য দশ কাহন বা কড়ি নির্দিষ্ট ছিল। একারণেই শেরপুর নামক প্রাচীন এই জনপদটি দশ কাহনিয়া শেরপুর নামে পরিচিত ছিল। এক সময়ে ব্রহ্মপুত্র নাসিরাবাদ শহর ( ময়মনসিংহ শহর) থেকে বোকাই নগর পর্যন্ত ১২ মাইল প্রশস্ত ছিল।
বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজত্বের শুরুতে স্টিফেন বেয়ার্ড নামক একজন ইংরেজ একাধারে ময়মনসিংহ জেলার কালেক্টর, ম্যাজিষ্ট্রেট ও জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তার সময়কাল ১৭৯০ থেকে ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। তিনি তার কার্যকালে কোম্পানীর উর্দ্বতন কর্ত্তৃপক্ষের নিকট প্রেরিত একটি পত্রে উলে¬খ করেন, “ ব্রহ্মপুত্রের ন্যায় ভীষণ নদীর তীরে এ জেলার সদর দপ্তর স্থাপন আমি কোন মতেই সঙ্গঁত মনে করিনা। বেগুনবাড়ীর কোম্পানীর কুঠী ব্রহ্মপুত্রের বিশাল উদরে স্থান পেয়েছে। ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে যমুনা নদীর সৃষ্টি। ফলশ্রুতিতে ব্রহ্মপুত্রের অধিকাংশ পানির প্রবাহ নবসৃষ্ট যমুনা দিয়ে সিরাজগঞ্জ-গোয়ালন্দের পথে বঙ্গোঁপসাগরে ধাবিত হলো। তখন থেকেই ময়মনসিংহ জেলা দিয়ে প্রবাহিত মূল ব্রহ্মপুত্র নদটি পূর্বের বিশালত্ব হারিয়ে ফেলতে থাকে। ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার কালেক্টর এইচ,জে, রেনল্ডস (ঐ.ঔ.জবুহড়ষফং) বললেন,“ দশ বৎসর পূর্বে আমি ব্রহ্মপুত্রের যে অবস্থা দেখেছিলাম, বর্তমান অবস্থা সে অপেক্ষা অনেক শোচনীয়। আমার বিশ্বাস এরূপ অবস্থায় ২৫ বৎসর চললে বিশাল ব্রহ্মপুত্র নিশ্চয়ই একটি অদৃশ্য সূত্রের আকার ধারণ করবে।” তিনি আরও বলেছিলেন, “ যদি উজানের বাঁধ (বালি ও পলির স্তার) সরিয়ে ফেলা হয় এবং যমুনার প্রবাহিত স্রোত ব্রহ্মপুত্রের খাতে প্রবাহিত করার ব্যবস্থা করা হয়, তবেই ব্রহ্মপুত্র পূর্বের বিশালত্বে ফিরে আসবে।” রেনল্ডস সাহেবের মন্তব্যে একশত ভাগ বাস্তাবতা নিহিত ছিল। ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে তদানীন্তন বৃটিশ ভারতের সরকার ইঞ্জিনিয়ার সহ সংশি¬ষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মীবাহিনী নিয়োগ করে ব্রহ্মপুত্রের সংস্কার কাজে হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু এই উদ্যোগ কোন আশাপ্রদ পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়নি।
ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী যমুনার সৃষ্টি হয়েছে নিকট অতীতে। এই নদীটি সৃষ্টির ফলে বাংলাদেশের উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের নদী প্রবাহ সহ ভূভাগের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে। শুধু ভূমির পরিবর্তন ঘটেছে এমন নয়। এর সাথে সাথে ধবংস হয়ে গেছে অসংখ্য সমৃদ্ধ নগর-বন্দর ও জনপদ। ব্যবসা বাণিজ্যসহ ব্যাপক জন মানুষের পেশা ও জীবিকার পরিবর্তন ঘটে গেছে। মোট কথা তিস্তা নদীর গতি পরিবর্তনের ফলে যমুনা নদীর সৃষ্টিসহ বিশাল ব্রহ্মপুত্রের মৃত্যুদশা এবং পদ্মার প্রবাহ পরিবর্তন ইত্যাদি বাংলার ইতিহাসে একটি বিশাল অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলার ভূপ্রকৃতিগত এই যে ব্যাপক পরিবর্তন, এর পেছনে প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব সরাসরি কিভাবে কাজ করেছিল এনিয়ে এদেশের ভূতত্ত্ববিদ সহ ইতিহাস বেত্তাগণের একাধিক মতামত রয়েছে।
প্রথমত: একটি তথ্যের ভিত্তি ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনাটি শুরু করা যেতে পারে। ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দের ২ এপ্রিল ঢাকা, চট্রগ্রাম, বরিশাল, ফরিদপুর সহ আসাম ও ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা অঞ্চলে প্রচন্ড ভূমিকম্প ঘটে যায়। রিখটার স্কেলে এর বিশালতা বা শক্তি ছিল ৭.৫ মাত্রা বিশিষ্ট (গধমহরঃঁফব) । এদেশের অনেক নদী বিশেষঞ্জ ও বিজ্ঞানী রয়েছেন যারা ধারণা করেন উক্ত ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্রের খাত পরিবর্তনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। শুধু ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের ভূমিকম্প নয় ১৮৯৭ সালের ১২ জুন অপরাহ্নে ঘটে যাওয়া এযাৎকালের ভয়াবহতম ভূমিকম্পের ফলে বাংলাদেশের অসংখ্য নদ-নদীর বিভিন্ন অংশের তলদেশের উচ্চতা বেড়ে যায়। এর ফলে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। এমন অনেক নদীর নাম এসে যাবে সেগুলোর প্রবাহ ভূমিকম্পের ফলে পূর্বের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ফলশ্রুতিতে এগুলো বিলুপ্তির পথে এগিয়ে গেছে। জে, এ, ভাস সংকলিত “ ইস্টার্ন বেঙ্গঁল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স রংপুর”- ১৯১১ নামক গ্রন্থের ৭৭ পৃষ্ঠায় এবিষয়ে নিম্নরূপ বর্ণনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- “ “The Earthquake made great changes in the drainage of the country. The beds of many streams and rivers were up heaved and also contracted by the slipping of their banks. Some of them such as the Gerai Nadi in police Station Nageshwari, The Bamni Nadi and Buri Tista in police station Ulipur, the sarai and manas in police stations Sundarganj and Gaibanda, the Nahalia and AKhira Nadis in police stations Mithapukur and Gobindganj. The Ghaghat river- a most important drainage channel in the district-is since 1897 a shallow sluggish stream with a weak current.”
উপরের বাস্তাব ভিত্তিক বর্ণনায় ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ঘটে যাওয়া বিধবংসী ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট নদ-নদীগুলোর আকৃতিগত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে গঙ্গাঁর (পদ্মা) অন্যতম প্রধান শাখা বড়াল নদের কিছু অংশের তলদেশ স্ফীত বা উন্নীত হবার ফলে (নাটোর জেলাধীন ধুপইল ও আটঘড়িয়া নামক গ্রামে) মূল স্রোত নন্দকুজা (বড়ালের শাখা) দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। এই সময়কার ভূমিকম্পটি ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল ব্রহ্মপুত্র সহ অনেক নদ-নদীর আকৃতিগত পরিবর্তনে। জে, সি জ্যাক (ঔ.ঈ. ঔধপশ) বৃহত্তর বাকেরগঞ্জ জেলায় জরিপ কার্য চালিয়েছেন ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে (১৯১৮) তিনি বাকেরগঞ্জ জেলার কালেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে গেছেন। জে,সি, জ্যাক কর্ত্তৃক সম্পাদিত Final Report on Survey and Settlement operations in Bakerganj 1900-1908’ নামক গ্রন্থে রয়েছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এই পুস্তাকের উদ্ধৃতি দিয়ে এপ্রিল ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে- বাংলাদেশ ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স টাঙ্গাঁইল নামক গ্রন্থের ১৫ পৃষ্ঠায়। গ্রন্থটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছে।
‘‘ তথ্যটি নিম্নরূপ- Mr. j. C. Jack has mentioned the earthquake of 1897 and the chittagong and Dhaka earthquakes of April 1762 as the major cause for formations of the Bhandaria Depression and the swrupkati beel of Bakerganj (Which continues into the Gopalganj Sub division, Faridpur district), Geologist are of firm opinion that the entire-eastern and north-eastern area of the sub-continent is geologically unstable.

উপরের তথ্যটির মর্মকথা হলো ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পে বরিশালের ভান্ডারিয়া, স্বরূপকাটি বিলসহ গোপালগঞ্জের নিম্ন জলাভূমির সৃষ্টি হয়েছিল। এই ভূমিকম্পের প্রভাব দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলেও ঘটে গেছে। ব্রহ্মপুত্রের খাত পরিবর্তন বা বর্তমানকালের যমুনা নদী সৃষ্টির বিষয়ে যে তথ্যটি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে -সেটি ছিল ‘উইকিপেডিয়া দি ফ্রি এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে নেয়া। তথ্যটি হচ্ছে- ``In the past the course of the lower Brahmaputra was different and passed through the jamalpur and mymensingh districts. In a 7.5 magnitude earthquake on 2 April 1762, the main channel of the Brahmaputra at Bahadurabad point was switched southwards and opened as Jamuna due to the result of tectonic uplift of the madhupur tract”

এস, সি মজুমদার, চীফ ইঞ্জিনিয়ার বেঙ্গঁল কর্ত্তৃক রচিত এবং ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত  `` Rivers of the Bengal Delta’’ নামক পুস্তাকের ৫৮ পৃষ্ঠায় রয়েছে ব্রহ্মপুত্রের তলদেশ উচ্চতা প্রাপ্ত হয়েছে ভূত্বকের বিকৃতি বা কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে (Tectonic uplift)। এখানে বিশেষভাবে প্রাচীন পলিমাটিযুক্ত মধুপুর বনাঞ্চলের উপর ভূমিকম্প জনিত প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
যমুনা নদীর সৃষ্টি এবং ব্রহ্মপুত্রের মূল ধারাটি নির্জীব বা শক্তিহীন হবার পেছনে একটি বহুল আলোচিত ও প্রচারিত কারণ রয়েছে। নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া এদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনাটির বিষয়ে তৎকালীন বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত অনেক কর্মচারী কর্মকর্তা সহ ইতিহাসবেত্তা ও ভূগোলবিদগনের লিখিত তথ্য সম্বলিত অসংখ্য দলিল প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর উপর ভিত্তি করে যে তথ্যটি মূখ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে- সেটি হচ্ছে তিস্তা নদীর গতি পরিবর্তন।
সংস্কৃত ভাষায় তিস্তা নদী ত্রিস্রোতা নামে আখ্যায়িত। এর অর্থ হচ্ছে তিস্তা নদী মোট তিনটি স্রোত বা প্রবাহের সৃষ্টি করেছে। নদী তিনটি হলো করতোয়া, আত্রাই ও পূনর্ভবা। করতোয়া পূর্ব দিকে, আত্রাই মাঝখানে এবং সর্ব পশ্চিমে পূনর্ভবা। তিস্তা প্রাচীন নদী। অষ্টাদশ শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত তিস্তা উৎস থেকে ( সিকিমের হিমালয় অংশের হিমবাহ পাহুনরী বা কাঙশী থেকে উৎপত্তি-উচ্চতা ৭,০৬৮ মিটার বা ২৩,১৮৯ ফিট) বিভিন্ন পাহাড়ি পথ বেয়ে ভারতের পশ্চিম বাংলা রাজ্যের জলপাইগুড়ি জেলায় এসে তিনটি নদীর জন্ম দিয়ে নিজ অস্তিাত্ব হারিয়ে ফেলে। জলপাইগুড়ির কুমারগঞ্জ ও সন্নিহিত এলাকা থেকে যে তিনটি নদী প্রাচীন কাল থেকেই প্রবাহিত হতো সেগুলো ছিল উলি¬খিত করতোয়া, আত্রাই ও পূনর্ভবা। তিস্তা থেকে উৎপত্তি লাভকারী তিনটি নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পদ্মায় এসে মিলিত হতো।
জে, এ, ভাস (J. A. Vas) সংকলিত ‘ ইস্টার্ন বেঙ্গঁল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স রংপুর’ নামক আকর গ্রন্থে তিস্তা সম্পর্কে উলি¬খিত তথ্যের পাশাপাশি কিছু পৌরানিক কাহিনী বর্ণিত হয়েছে-The Tista is an abbreviation of the sanscrit `Trishna’ implying Thirst and trisrota’ implying `` Three Currents” The `Kalika puran’ Thus explains the origin of the name- parbati, wife of siva, was engaged in mortal combat with a demon (Asur), who worshipped siva and refused to worship her. During the fight, the monster prayed to siva for water to quench his thirst, and the God caused a river to flow from the breasts of parbati in three streams.” P-4, 5. 
এই উপমাহাদেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীর সৃষ্টির পেছনে এই জাতীয় রূপকথা বা পুরাণ কথা জড়িয়ে রয়েছে। তিস্তার ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা- তিস্তা-করতোয়া-আত্রাই-পূনর্ভবা এসকল নদ-নদী নিয়ে পুরানে বর্ণিত কল্পকাহিনী রচিত হয়েছিল খুব সম্ভবত; অষ্টাদশ শতাব্দীর একেবারে শেষ পর্যায়ে কিংবা উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভকালে। আমরা যদি বাংলা দেশের উত্তরাঞ্চলের উলি¬খিত নদ-নদী গুলোর প্রাচীন ইতিহাস এবং ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন ও পর্যালোচনা করি তবে নিশ্চিতভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌছে যাব যে- আত্রাই-করতোয়া- পূনর্ভবা প্রাচীনকালে তিস্তার শাখা ছিলনা। পূনর্ভবা ছিল করতোয়ার শাখা। পৌরানিক নদী করতোয়ার উৎস সরাসরি হিমালয় পর্বত থেকে। পরবর্তীকালে পূনর্ভবা ও করতোয়া ভূপ্রকৃতিগত পরিবর্তনের কারণে তিস্তার শাখা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আত্রাই নদীটি প্রাচীনকালে তিস্তার শাখা হিসেবে প্রবাহিত হয়নি।
মেজর জেমস রেনেল ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশের নদ-নদীর জরিপ কাজ চালিয়েছেন। ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রকাশিত হয়েছে নদ-নদী সংক্রান্ত মানচিত্র ও নকসা। ১৭৭৮-৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মেজর রেনেলকৃত মানচিত্রে তিস্তার তিনটি ধারা দেখানো হয়েছে। এগুলো করতোয়া, আত্রাই ও পূনর্ভবা।
করতোয়া তিস্তার পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। রেনেলের নদী জরিপের (সার্ভে) সময় তিস্তার মূল স্রোত আত্রাই নদীর খাতে প্রবাহিত হতো। তৃতীয় প্রবাহটি অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ। এটি তিস্তার পশ্চিমমুখী ধারা পূনর্ভবা। রেনেলের জরিপের সময়ে মাঝখানের ধারা আত্রাই তিস্তাকে প্রতিনিধিত্ব করেছে। এসময়ে করতোয়া বেপরোয়া-বেগবতী নয়।
ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি যখন গৌড় জয় করেন (১২০৩ মতান্তরে ১২০৫) সে সময়ে কিংবা চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাং যখন পুন্ড্রনগর বা মহাস্থান পরিদর্শন করেন (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে) সে সময়ে করতোয়া ছিল উত্তরাঞ্চলের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ নদী। বখতিয়ার খিলজির তিব্বত অভিযানকালে করতোয়া ছিল সুবিশাল নদী। সরাসরি হিমালয় থেকে নেমে আসা অজস্্র জলরাশি দ্বারা সমৃদ্ধ করতোয়া জলপাইগুড়ি, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া হয়ে পাবনার বিশাল চলনবিল অতিক্রম করে আরও পূর্ব দিকে এসে পদ্মায় মিলিত হতো।‘ তবকাত-ই-নাশিরী’ নামক প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থের লেখক মিনহাজ-ই-সিরাজ এয়োদশ শতাব্দীর করতোয়ার বর্ণনা উক্ত গ্রন্থে প্রদান করেছেন যেখানে বলা হ্েচ্ছ যে, করতোয়া গঙ্গাঁ নদীর চেয়েও তিনগুন বৃহৎ ছিল। সে সময়ে করতোয়া থেকেই পূনর্ভবা ও আত্রাই নদীর সৃষ্টি। করতোয়া প্রাচীনকাল থেকে অসংখ্যবার খাত পরিবর্তন করেছে। জলপাইগুড়ি, বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও পাবনা জেলার বিভিন্ন অংশে প্রাচীন করতোয়ার অনেক পরিত্যক্ত খাত এখনও এই সত্যের সাক্ষী বহন করে চলেছে।
বখতিয়ার খলজি দেবকোট নামক (পশ্চিম বঙ্গেঁর গঙ্গাঁরামপুর থানা) পূনর্ভবা তীরবর্তী প্রাচীন নগরে রাজধানী স্থাপন করে কয়েকটি প্রশাসনিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর শাসনকাজ শুরু করেছিলেন। পূনর্ভবা তীরবর্তী দেবকোট নামক প্রাচীন শহরটি ছিল বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রথম রাজধানী। এরও অনেককাল পূর্বে দেবকোটের বিপরীত দিকে (পূনর্ভবার তীরে) বাণগড় নামক প্রাচীন শহরটি ছিল পাল রাজাদের রাজধানী। পাল রাজাগণ তাঁদের চারশত বছরের রাজত্বকালের অনেক স্মৃতি রেখে গেছেন এই বাণগড়ে। বখতিয়ার খলজির অসফল তিব্বত অভিযানের পর তিনি অবশিষ্ট সৈন্যদল সহ দেবকোট নগরীতে ফিরে আসেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই এখানে তার মৃত্যু ঘটে। দেবকোটে রয়েছে বখতিয়ার খলজির সমাধিক্ষেত্র।
বাংলায় মুসলিম বিজয়ের সূচনা পর্বে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বিজিত অঞ্চলকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন। একেকটি ভাগকে বলা হতো ‘ইকতা’। খ্রিষ্টীয় এয়োদশ শতাব্দীর একেবারে শুরুতেই বখতিয়ার খলজি পূনর্ভবা নদী তীরবর্তী দেবকোটে নতুন রাজ্যের রাজধানী হিসেবে গোড়াপত্তন করেন। এখানে অবস্থান করে তিনি অন্যান্য ইকতা বা অঞ্চলগুলোর শাসনকাজ পরিচালনা শুরু করেন। বখতিয়ার খলজির ছিল প্রধান তিনজন সেনাপতি। এরা হলেন আলী মর্দান খলজি, হুসাম-উদ্দিন ইত্তজ খলজি এবং মুহাম্মদ শিরন খলজি। আলী মর্দান খলজি ছিলেন করতোয়া তীরবর্তী বরসৌল (অশ্বঘাট বা ঘোড়াঘাট) এবং আত্রাই তীরবর্তী নরনকোই (নাটারী-নারকুটী বা নাটোর) এর মুক্তা বা শাসনকর্তা। অপর একজন সেনাপতি মুহাম্মদ শিরন খলজি মাহীসন্তোষ (মাসীদাসন্তোষ) এলাকার মুকতা বা শাসনকর্তা ছিলেন। মাহী সন্তোষ নগরটি আত্রাই তীরবর্তী।
উলি¬খিত আলোচনা থেকে একটি বিষয়ে পরিষ্কার ধারনা পাওয়া যাচ্ছে যে, কালিকা পুরানে বর্ণিত তিস্তার ‘িিতস্তার মহাপ্লাবন ব্রহ্মপুত্রের নতুন প্রবাহ যমুনা
মাহবুব সিদ্দিকী

ব্রহ্মপুত্রের নতুন ধারা যমুনা
যমুনা নামে বাংলাদেশে ও পার্শ্ববর্তী ভারতের পশ্চিম বাংলা আসামসহ সর্বমোট নদী রয়েছে ৭ টি। আলোচ্য যমুনা নদীটি সবচেয়ে নবীন এবং সর্ববৃহৎ। এটি ব্রহ্মপুত্রের অন্যতম বৃহৎশাখা। অপর ৬ টি যমুনার মধ্যে যমুনা (পঞ্চগড়) নামক নদীটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি আন্ত:সীমান্ত নদী। যমুনা (পঞ্চগড়) ভারতের জলপাইগুড়ি জেলাধীন ভক্তিনগর থানা এলাকায় তিস্তা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে জলপাইগুড়ি সদর থানার শেষ সীমান্তগ্রাম সরদারপাড়া অতিক্রম করে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলাধীন চাকলাহাট ইউনিয়নের অন্তর্গত সিংরোড প্রধানপাড়া নামক গ্রামে প্রবেশ করেছে। এরপর ৮ কিলোমিটার বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে পুনরায় ভারতে প্রবেশ করেছে। ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার মধ্যে সামান্য পথ পরিক্রমার পর পুনরায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে কুরুম নদে পতিত হয়েছে। যমুনা (পঞ্চগড়) নদীটি বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে আন্ত: সীমান্ত নদী হয়েও যৌথ নদী কমিশনের তালিকা ভূক্ত হয়নি।
ছোট যমুনা নামে একটি নদী দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। দিনাজপুর জেলার ইছামতি নামের নদীটি পার্বতীপুর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়ন এলাকায় এসে ছোট যমুনা নাম ধারণ করেছে। দিনাজপুর জেলাধীন ফুলবাড়ী, বিরামপুর ও হাকিমপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অত:পর জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি ও জয়পুরহাট সদর উপজেলা এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নওগাঁ জেলায় প্রবেশ করেছে। নওগাঁ জেলার ধামইরহাট, পত্নীতলা, বদলগাছী, নওগাঁ সদর, রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নে আত্রাই নদীতে পতিত হয়েছে। ছোট যমুনার দৈর্ঘ্য ১৯৫ কিলোমিটার।
যমুনেশ্বরী নামে নীলফামারী জেলায় উৎপত্তি লাভ করেছে একটি নদী। উৎসমুখ নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলাধীন কেতকীবাড়ী ইউনিয়নের বিলাঞ্চল। উৎস মুখে নদীটি পানগা নামে পরিচিত। প্রবাহপথে ডোমার উপজেলার শেষাংশ থেকে জলঢাকা (নীলফামারী) উপজেলার শিমূলবাড়ী ইউনিয়ন পর্যন্ত নদীটি দেওনাই নামে পরিচিত। শিমূলবাড়ী থেকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি ইউনিয়ন পর্যন্ত এটি চাড়ালকাটা নদী নামে পরিচিত। এরপর সামান্য দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ উপজেলাধীন চাঁদখানা ইউনিয়ন এলাকায় এসে নদীটি যমুনেশ্বরী নাম ধারণ করেছে। যদিও নীলফামারী সদর উপজেলা এলাকায় নদীটি যমুনেশ্বরী নামেই পরিচিত। এরপর যমুনেশ্বরী রংপুর জেলার তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলা এলাকা অতিক্রম করে দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলাধীন মাহমুদপুর ইউনিয়নে করতোয়া (নীলফামারী) নদীতে পতিত হয়েছে। দেওনাই-চাড়ালকাটা-যমুনেশ্বরী নদীর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ১১৬ কিলোমিটার।
বাংলাদেশের চতুর্থ যমুনা নদীটি আসলে হিন্দু পুরাণে উলি¬খিত যুক্তবেণীর (যমুনা-সরস্বতী-গঙ্গাঁ) অন্যতম প্রধান প্রবাহ ভারতের উত্তরাঞ্চলের পৌরানিক নদী যমুনার সর্বনিম্ন ধারা। উত্তর ভারতের প্রাচীন শহর এলাহাবাদ (প্রয়োগ বা মহাভারতোক্ত বারনাবত) পর্যন্ত প্রবাহটি যুক্তবেণী (গঙ্গাঁ-যমুনা-সরস্বতীর সম্মিলিত ধারা) নামে পরিচিত। পশ্চিম বাংলার হুগলি জেলাধীন চুঁচুড়া মহকুমার অন্তর্গত ত্রিবেনি নামক হুগলী (ভাগীরথী) নদীর পশ্চিম তীরবর্তী প্রাচীন তীর্থ শহরে এসে তিনভাগে বিভক্ত হয়েছে। এখানে গঙ্গাঁ যুক্ত হয়ে তিনভাগে বিভক্ত। গঙ্গাঁ যুক্তবেণী নামে পরিচিতি পেয়ে তিনটি ধারায় তিনদিকে প্রবাহিত হয়েছে। একটি ধারা পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হয়ে সরস্বতী নাম ধারণ পূর্বক বাংলার প্রাচীন বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক শহর সপ্তগ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বর্তমানে এই প্রবাহটি বিলুপ্ত। মাঝের ধারাটি আদিগঙ্গাঁ হিসেবে পরিচিত। এই ধারাটি সোজা দক্ষিণাভিমুখী হয়ে কলকাতা শহর বিধৌত করে বঙ্গোঁপসাগরে চলে গেছে। তৃতীয় ধারাটির নাম যমুনা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীগন এই ধারাটিকেই শ্রীকৃষ্ণের মথুরা শহর কিংবা সম্রাট শাহজাহানের আগ্রা শহরের বিখ্যাত যমুনা নদীর ভাটির অংশ বলে বিশ্বাস করেন। ত্রিবেনী থেকে মুক্ত হয়ে যমুনা পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত ও বসিরহাট মহকুমার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইছামতি (সাতক্ষীরা) নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। বসিরহাট মহকুমাধীন হাসনাবাদ থানার অন্তর্গত টাকি নামক পৌরশহর এবং বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলাধীন দেবহাটা উপজেলার টাউনশ্রীপুর নামক পৌরশহরের মাঝ দিয়ে ইছামতি নদী বা যমুনা নদী দক্ষিণমুখী প্রবাহ পথে অগ্রসর হয়েছে। প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে চলার পর দেবহাটা শহরটিকে পূর্বপাড়ে রেখে আরও কিছুটা পথ দক্ষিণে এসে পুনরায় সামান্য পশ্চিমমুখী হয়ে বসিরহাট মহকুমাধীন হাসনাবাদ থানা শহরে প্রবেশ করেছে। এখান থেকে যমুনা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বসন্তপুর (প্রতাপাদিত্যের পিতৃব্য বসন্তরায়ের গড়া শহর) নামক প্রাচীন জনপদে পৌছে গেছে।এখান থেকে যমুনা দক্ষিণ-পূর্বমুখী হয়ে ভারতের সীমানা অতিক্রম করে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলাধীন কালীগঞ্জ উপজেলা এলাকায় প্রবেশ করেছে। এর পূর্বে বসন্তপুরে যমুনা থেকে কালিন্দী নামে একটি শাখা নদীর জন্ম হয়েছে। কালিন্দী দক্ষিণে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে আরও ভাটিতে গিয়ে রায়মঙ্গঁল নদের সাথে মিশে গেছে। যমুনা কালীগঞ্জ শহর অতিক্রম করে দক্ষিণের শ্যামনগর এবং প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ধুমঘাট নামক স্থানের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর বংশীপুর নামক স্থানে এসে দুইটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে। মূল ধারাটি যমুনা নামে দক্ষিণ-পশ্চিম মুখী অবস্থায় রমজান নগর নামক জনপদের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছে। এরপর সোজা আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে রায়মঙ্গঁল নদের সাথে মিশে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত রচনা করেছে। এভাবে আরও অনেকটা পথ সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রায়মঙ্গঁল মোহনা দিয়ে বঙ্গোঁপসাগরে পতিত হয়েছে।
যমুনা নামের পঞ্চম প্রবাহটির অবস্থান ভারতের পশ্চিমবাংলা রাজ্যের বীরভূম জেলার রামপুরহাট মহকুমাধীন বীরচন্দ্রপুর নামক গ্রামে। এখানকার যমুনা দ্বারকা নদীর একটি শাখা।
যমুনা নামের আরেকটি নদী রয়েছে ভারতের আসাম রাজ্যের নওগাঁ জেলায়। যমুনা নামের এই নদীটি উৎপত্তি লাভ করেছে নাগাপাহাড় থেকে। যমুনা নদীটি আসাম রাজ্যের নওগাঁ জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া কাপিলী (ব্রহ্মপুত্রের উপ-নদী) নদীর অন্যতম প্রধান উপনদী।
বাংলাদেশে বিশাল জলাভূমি বা নদ-নদীকে রূপকার্থে যমুনা নামে আখ্যায়িত করা হয়। আমাদের দেশের কবি সাহিত্যিকগন বিশেষ করে লোক সাহিত্যে এজাতীয় উদাহরণ রয়েছে অসংখ্য। আলোচ্য যমুনা নামে পরিচিত ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদীটির আবির্ভাব ১৭৮৭ খ্রিষ্টব্দের পর থেকে প্রকাশিত হয়েছে নদ-নদী সংক্রান্ত মানচিত্র ও নকসা। ১৭৭৮-৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মেজর রেনেলকৃত মানচিত্রে তিস্তার তিনটি ধারা দেখানো হয়েছে। এগুলো করতোয়া, আত্রাই ও পূনর্ভবা।
করতোয়া তিস্তার পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। রেনেলের নদী জরিপের (সার্ভে) সময় তিস্তার মূল স্রোত আত্রাই নদীর খাতে প্রবাহিত হতো। তৃতীয় প্রবাহটি অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ। এটি তিস্তার পশ্চিমমুখী ধারা পূনর্ভবা। রেনেলের জরিপের সময়ে মাঝখানের ধারা আত্রাই তিস্তাকে প্রতিনিধিত্ব করেছে। এসময়ে করতোয়া বেপরোয়া-বেগবতী নয়।
ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি যখন গৌড় জয় করেন (১২০৩ মতান্তরে ১২০৫) সে সময়ে কিংবা চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাং যখন পুন্ড্রনগর বা মহাস্থান পরিদর্শন করেন (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে) সে সময়ে করতোয়া ছিল উত্তরাঞ্চলের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ নদী। বখতিয়ার খিলজির তিব্বত অভিযানকালে করতোয়া ছিল সুবিশাল নদী। সরাসরি হিমালয় থেকে নেমে আসা অজস্্র জলরাশি দ্বারা সমৃদ্ধ করতোয়া জলপাইগুড়ি, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া হয়ে পাবনার বিশাল চলনবিল অতিক্রম করে আরও পূর্ব দিকে এসে পদ্মায় মিলিত হতো।‘ তবকাত-ই-নাশিরী’ নামক প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থের লেখক মিনহাজ-ই-সিরাজ এয়োদশ শতাব্দীর করতোয়ার বর্ণনা উক্ত গ্রন্থে প্রদান করেছেন যেখানে বলা হ্েচ্ছ যে, করতোয়া গঙ্গাঁ নদীর চেয়ে?


বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top