সুশিক্ষায় সুশিক্ষক

মুহাম্মদ আব্দুল মুমীত | প্রকাশিত: ৪ জানুয়ারী ২০২১ ১৯:০৪; আপডেট: ৪ আগস্ট ২০২১ ০৬:০৬

উন্নয়নের স্বয়ংক্রিয় ধারা বেগবান ও চলমান রাখার নিমিত্ত দেশের জনসংখ্যাকে মানব সম্পদে পরিণত করতে প্রয়োজন শিক্ষা। আর শিক্ষা বিস্তারের এই মহান অথচ দুরূহ দায়িত্বটি নিরলসভাবে- অনেকটা মায়ায় পালন করে থাকেন শিক্ষক। এ জন্য ‌'শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড', আর শিক্ষককে শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড বলা হয়। তবে সে শিক্ষাটি হতে হবে সুশিক্ষা; যার জন্য প্রয়োজন হয় সুশিক্ষকের। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- 'জীবনের সাথে জীবনের আশ্রয়স্থল খোঁজার নামই শিক্ষা' অর্থাৎ মানুষ অপার শক্তির মহিমা অনুসন্ধান ও আবিষ্কারে আত্মজিজ্ঞাসার যে উন্মেষ ঘটায় তাই শিক্ষা। অন্যদিকে যে শিক্ষা মানুষকে মনুষ্যত্বের বিকাশের মাধ্যমে চরিত্রবান, সুশিল, পরিমার্জিত, সংস্কৃতিবান ও আদর্শবান করে গড়ে তোলে তাই সুশিক্ষা। সুশিক্ষা মানুষকে সৎ চিন্তা ও সৎ কর্মে উদ্দীপ্ত করে কর্মকৌশল উদ্ভাবনের মাধ্যমে দক্ষতার উন্নয়ন ঘটায়। অর্থাৎ যে শিক্ষায় মানবীয় গুণাবলী বিকশিত হয় সৎ, যোগ্য ও চরিত্রবান নাগরিক তৈরি হয় তাই সুশিক্ষা। সুশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর কোমল হৃদয়কে আন্দোলিত করে তাদেরকে সুদক্ষ, সৃজনশীল, দায়িত্বশীল, দেশপ্রেমিক, কর্তব্য পরায়ণ, নিষ্ঠাবান, সৎ ও যোগ্য জনসস্পদে রূপান্তরে সুশিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম।

শিক্ষক বলতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত থেকে ছাত্রদের সুশিক্ষা প্রদানের ব্যাপারে যাঁরা নিয়োজিত থাকবেন, তাঁদেরকে বুঝানো হয়েছে (শিক্ষকের মর্যাদা বিষয়ক ইউনেস্কো ও আইএলও সনদ)। অন্যদিকে নৈতিকতা ও বিবেকবোধ সম্পন্ন মানবিক মূল্যবোধ সমৃদ্ধ শিক্ষকই সুশিক্ষক। শিক্ষক হলেন শিক্ষাগুরু; যাঁর মর্যাদা অবস্থানগতভাবে সমাজের সবার উর্দ্ধে। যে সমাজে শিক্ষককে সম্মান দেয়া হয় না, সে সমাজে মানুষ তৈরি হয় না। শিক্ষার্থীর সামাজিকীকরণ ও তাদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের ভিত নির্মাণ এবং সামাজিক পরিবর্তনে শিক্ষক অনুঘটক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তাই শিক্ষকতা কোন পেশার নাম নয় বরং এটা নেশা। স্যার জন এডাম এঁর মতে- 'শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর'। মানুষ হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো কারখানায় মানুষ তৈরির কাজটি অত্যন্ত জটিল এবং সংবেদনশীল। একজন সুশিক্ষক জটিল এ কাজটিকে সহজতর করে থাকেন পুতপবিত্র হৃদয়ের ছোঁয়ায় ভালোবেসে আর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর আত্মাকে উদ্বেলিত করার মাধ্যমে।

সুশিক্ষক সবসময় সুশিক্ষিত, সুদক্ষ ও সুনিপুণ যিনি আলোক বর্তিকার মতো উদ্ভাসিত হতে থাকেন মমতা, ন্যায়পরায়ন, দয়ালু, সরলতা, কর্তব্যপরায়ন, বিনয়ী ও দেশপ্রেমের আলোক ছটায়। শিশু হয়ে জন্ম গ্রহণ করা একটি অপরিপক্ক মানব সন্তান শুরুতে মা-বাবার নিবিড় তত্ত¡াবধানে বেড়ে উঠতে থাকে এবং জীবনের অনুবর্তিকায় প্রাক-শৈশব, শৈশব, বয়:সন্ধি, যৌবন, বয়স্কতা হয়ে বার্ধক্যে উপনিত হয়। প্রাক-শৈশব অতিক্রম করার পর মানব সন্তান বিদ্যালয় নামক শিক্ষাগৃহে বাবা-মার বন্ধন তুচ্ছ করে সুশিক্ষা অর্জনের অভিপ্রায়ে এক অজানা অদৃশ্য শূণ্যতায় যে মানুষগুলোর কোমল স্নেহস্পর্শী ছোঁয়ায় প্রাণোচ্ছল ও গতির্ময় হয়ে ওঠে তিনিই হলেন শিক্ষক। হেনরী এডাস এঁর মতে- 'শিক্ষকের প্রভাব অনন্তকালে গিয়েও শেষ হয় না'। অর্থাৎ একজন সুশিক্ষকের কখনো অবসর হয় না। শিক্ষার্থীর প্রমোশন হয়, প্রতিষ্ঠানের বদল হয় কিন্তু শিক্ষক তাঁর হৃদয়ের সুদৃষ্টি সুপ্রসারিত করে অপরিবর্তিতই থেকে যান অনাদি অনন্তকাল! একজন সুশিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীকে কি চিন্তা করতে হবে তা না শিখিয়ে, কিভাবে চিন্তা করতে হবে তা শিখিয়ে দেন। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও মননশীলতাকে এমনভাবে গড়ে তোলেন যাতে তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করার মানসিকতা অর্জনে সক্ষম হয়। তাইতো সুশিক্ষক একজন দার্শনিক। শামসুল হক এঁর মতে- 'দর্শনবিহীন শিক্ষক কান্ডারী বিহীন নৌকার মত' । শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষক হবেন: A friend, a guide and a philosopher অর্থাৎ শিক্ষক হবেন বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ, দক্ষ, নিষ্ঠাবান ও দার্শনিক।

স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের দেশের নজর কাড়ার মতো উন্নয়ন ও অগ্রগতি হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে ডিজিটালের পথে বহুদুর এগিয়েছে দেশ । নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও জাতীয়করণ এবং আইসিটিসহ অবকাঠামোর যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে; কিন্তু গুণগতমানের ঈর্ষনীয় সাফল্য তেমন দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে সুশিক্ষার জন্য সুশিক্ষকের আবশ্যকতা আজও আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুুরসহ বিশে^র প্রায় সকল দেশেই শিক্ষকতা পেশা শ্রদ্ধা ও মর্যাদার; কিন্তু আমরা শিক্ষকের সেই সম্মানের জায়গাটি আজও সুনিশ্চিত করতে পারিনি। যে কারণে পেশাটি মেধাবীদের আকর্ষিত করতে পারে না, যারা হয় শুরু থেকেই অন্যত্র চলে যাওয়ার উপায় খুঁজতে থাকে অথবা পেশাটিকে গৌণ করে অন্যকর্মের পরিচয় বহন করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। তাই শিক্ষকতা পেশাটি নেশা না হয়ে আর দশটি পেশার মতো সাধারণ একটি পেশা রূপেই মাথা হেট করে নিস্তেজ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। যে পেশাটি একদিন শিক্ষার্থী ও সমাজের সকলের কাছে ছিল ভক্তি ও শ্রদ্ধার; এমনকি শিক্ষকের সুপারিশে অনেক মামলার জট খুলে যেত; শিক্ষককে দেখলে সরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাও চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে যেতেন; গ্রাম্য সালিশে শিক্ষকের বিচার মেনে নেয়া হতো অবলীলাক্রমে অথচ আজ? অতীতে শিক্ষকেরা অনেকটা অর্থকষ্ট ও মনোকষ্ট মানিয়ে নিয়ে এ পেশায় আসতেন এবং কোন ভাবে সংসার চালিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে সদা মনোযোগী থাকতেন। শিক্ষকরা সর্বদা সতর্ক থাকতেন কোনক্রমেই যেন আচার-আচরণে শিক্ষকসুলভ চরিত্র হতে বিচ্যুতি না ঘটে। তখনকার দিনে বিচ্যুতি ছিল বিরল ও অস্বাভাবিক ঘটনা; দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে চিত্র আজ পাল্টে গেছে অনেকটা-ই।

সুশিক্ষক শিক্ষার্থীকে আকৃষ্ট করে থাকেন হৃদয়ের উপলদ্ধি দিয়ে; এর ব্যতিক্রম হলে শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্র্থীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি জাগ্রত হয় না। বিষয়ের পান্ডিত্য ও গভীরতা শিক্ষার্থীর কোমল হৃদয়কে আন্দোলিত করে। শিক্ষকের বাচন ভঙ্গি প্রাঞ্জল ও পরিমার্জিত না হলে, আচার-আচরণ পরিশীলিত না হলে, ভাষার স্নিদ্ধতা মধুর না হলে শিক্ষার্থী মনোযোগী হয় না। ছাত্র-ছাত্রীর অমনোযোগীর কারণ অনেকটাই শিক্ষকের মধ্যে লুকায়িত থাকে; শিক্ষার্থীকে মনোযোগী করতে পারার মধ্যেই শিক্ষকের সর্থকতা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- 'যে শিক্ষক নিজেই যথার্থ নহেন, তিনি অন্যকে শিক্ষাদান করিবেন কিভাবে? যে প্রদীপ নিজেই জ¦লিতেছে না বা আলোদান করিতেছে না সে প্রদীপ হইতে অন্য প্রদীপ কিভাবে প্রজ্জলিত হইবে বা আলো গ্রহণ করিবে?'।

শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় পাশ করানোর মধ্যেই শুধু শিক্ষকের সফলতা নয়; জ্ঞানের দেওয়াল উন্মুক্ত করে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে না পারলে এ পাশ অর্থহীন। অনেক শিক্ষক আছেন যারা সুশিক্ষক নন। তাঁরা শিক্ষার্থীদের নোট মুখস্থ করান এবং প্রশ্ন নির্বাচন করে দেন; যেকোন কৌশলে পরীক্ষার হলে প্রবেশের ফন্দি-ফিকির করেন: এক পর্যায়ে নকল সরবরাহের মতো জঘন্য অপকর্মের সংগেও জড়িয়ে পড়তে দ্বিধা করেন না। অবশ্যই মনে রাখতে হবে শিক্ষা পণ্যের দোকানী সাজা আর শিক্ষক হওয়া এক কথা নয়; শিক্ষার মতো অমূল্য সম্পদের বিতরণ হতে পারে, কেনা-বেচা নয়। শিক্ষকতায় আত্মতৃপ্তি, অনাবিল আনন্দ এবং গৌরববোধ না থাকলে সুশিক্ষক হওয়া যায় না। এজন্য শিক্ষককে হতে হবে বই মুখী; বাস্তবতায় বরং ভিন্ন চিত্রই পরিলক্ষিত হয়! সরদার সৈয়দ আহমেদ এর মতে- 'শ্রেণি কক্ষে শিক্ষকের অমনোযোগিতা ও অনাগ্রহের কারণে গৃহ শিক্ষকতা এবং কোচিং সেন্টার নামক বিদ্যা বিপণী বিতানের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া শিক্ষকগণ প্রশ্নপত্র ফাঁস ও উত্তরপত্র কেলেংকারিতেও জড়িয়ে পড়েছেন'। বর্তমানে শিক্ষকের মধ্যে পেশার প্রতি ভালোবাসা বা পেশাদারিত্ব, সেবা করার মনোবৃত্তি, শিক্ষাদানে আত্মতৃপ্তিবোধের চরম সংকট পরিলক্ষিত হয়। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এঁর মতে- 'যদি কোন শিক্ষক সম্মান না পান তবে কি ধরে নিতে হবে না ঐ অসম্মানের অনেকখানি যোগ্যতা তাঁর ভিতরেই রয়েছে? পরীক্ষার হলে ছাত্রদের নকল সরবরাহের দায়ে যে শিক্ষক পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে বহিস্কৃত, যে অধ্যক্ষ শিক্ষকদের সংগে যোগসাজশে কলেজের অর্থ আত্মসাতে জড়িত, যে-উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় রাজনীতির ভাগাড় করে তুলেছেন, যে রজতলিপ্সু শিক্ষক ছাত্র-শিক্ষক সর্ম্পকে কেবল আর্থিক লেনদেনের পর্যায়ে নামিয়ে আনছেন বা যে-শিক্ষক এমনিতেই মেধাহীন, মূঢ় এবং অকর্ষিত তাঁর সম্মানের ব্যবস্থা কে দিতে পারে ?'

সুশিক্ষকের জন্য জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্তৃক ১৯৬৬ সালের ০৫ অক্টোবরে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুুষ্ঠিত বিশেষ আন্তরাষ্ট্রীয় সম্মেলনে গৃহীত সনদটি এবং শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক আব্দুল্লাহ আল মুতী এঁর নির্দেশনা অনুসরণ করা অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য। একই সংগে আইসিটি বিষয়ে যথেষ্ট পারদর্শীতা থাকা প্রয়োজন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায় - 'অশিক্ষার অন্ধকার থেকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠিকে মুক্ত করতে না পারলে দেশের শ্রীবৃদ্ধি বেগমান করা অসম্ভব'। আর এখানেই সুশিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। পৃথিবীতে যত পেশার মানুষ রয়েছেন তাঁরা প্রত্যেকেই কোন না কোন ভাবে শিক্ষকেরই উৎপাদ; তাই জাতির বৃহত্তর কল্যাণে ও মঙ্গলের নিমিত্ত অবশ্যয় এ আস্থার জায়গাটি প্রশস্থ করতে হবে। বিশ্বাস এবং আন্তরিকতাই এক্ষেত্রে উত্তোরনের একমাত্র উপায় হতে পারে।

ইমেইল: [email protected]

এনএস



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top