“ একুশ বাঙালি জাতিকে প্রতিবিন্দু রক্তে জাগরণের জন্ম দিয়েছে ”

মো. আব্দুর রাজ্জাক | প্রকাশিত: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০০:১০; আপডেট: ১ ডিসেম্বর ২০২২ ০৯:৪৪

ফাইল ছবি

ক. শুরুকথা:
.....চিঠিটা তার পকেটে ছিল,
ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা
‘মাগো, ওরা বলে
সবার কথা কেড়ে নেবে
তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না।
বলো, মা, তাই কি হয়?

একুশ উপলক্ষে সমকালিন বাংলা ভাষার অন্যতম কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতার কথাগুলোর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বেদনার কথা মনে পড়ে, অন্যদিকে তেমনি মনে জাগে বিপ্লবের বাণী। একুশ আমাদের প্রাণ, একুশ আমাদের অহংকার। রক্তরাঙা, বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অমর একুশে ফেব্র“য়ারি। ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির মধ্যে এক নতুন জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটায় এবং বাঙালীদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি লাভের আন্দোলন দুর্বার করে তোলে। ভাষার মধ্যে মাতৃভাষার মূল্য সবচাইতে বেশী। এ কারণেই আল্লাহ পৃথিবীতে যুগে যুগে তাঁর জীবনবিধান নিয়ে যত নবী-রাসুল (স.) পাঠিয়েছেন, তাদের সবাইকে পাঠিয়েছেন স্ব-স্ব জনগোষ্ঠী বা কওমের ভাষা তথা মাতৃভাষায়। কারণ যে-কোনো জাতির শিক্ষা ও উন্নতির জন্য মাতৃভাষার ব্যবহার সবচাইতে উপযোগী। একই কারণে যে-কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণের মাতৃভাষা যদি রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে ব্যবহৃত হয় তাহলে সে রাষ্ট্রের উন্নতির গতি ত্বরান্বিত হয়।
খ. মাতৃভাষা মৌলিক অধিকার: ভাষা আল্লাহর দান, আল্লাহ তায়ালার সেরা নেয়ামত। মাতৃভাষা মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম। ভাষা মনুষ্যপরিচয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রাণকুল, পশুসমাজ থেকে স্বাতন্ত্রের প্রধান উপাদান হলো ভাষা। ইসলাম সব ভাষাকে সম্মান করতে শেখায়। কারণ, সব ভাষাই আল্লাহর দান ও তাঁর কুদরতের নিদর্শন। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে। সুরা রুম, আয়াত- ২২।

গ. প্রেক্ষাপট: ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ভাষা-সংস্কৃতি হারানোর উপক্রম হয়। পাকিস্তানি শাসকরা বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি চরম অবজ্ঞা পোষণ করে সেদিন বাঙালি জাতিকে নতুন করে যে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে, তার পরিণাম ছিল ভয়াবহ। পাকিস্তানি নব্য উপনিবেশবাদী শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই এদেশের নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতনের স্ট্রিম রোলার অব্যাহত রাখে। তাদের প্রথম ফন্দি ছিল কীভাবে বাংলার মানুষের মুখের ভাষাকে ছিনিয়ে নেয়া যায়। এরই অংশ হিসেবে তারা বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাঙালির ঘাড়ে পাকিস্তানি ঈঁষঃঁৎব চাপিয়ে দেয়ার নীলনকশা অঙ্কন করে। তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে এক সমাবেশে ঘোষণা দেন-Urdu & Urdu shall be the state language of Pakistan, কিন্তু এদেশের ছাত্র-যুবকরা সে সমাবেশেই- No, No, It can’t be নব ধ্বনি তুলে তার এ ধৃষ্টতাপূর্ণ ঘোষণার বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানায়। পাকিস্তানি সরকার সব প্রতিবাদকে পাশবিক শক্তি দ্বারা দমনের চেষ্টা চালায়। তাদের বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় এদেশের মানুষ। বাংলার দামাল ছেলেরা শুধু নয়, সর্বস্তরের মানুষ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বজ্র কঠিন শপথ গ্রহণ করে। বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে ঐ ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। এ আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়ায় ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের বাঙালি জনগণ।

ঘ. ঘটনা ও ফলাফল: ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে করাচিতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি শিক্ষাবিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে উর্দুকে সমগ্র পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঢাকায় সর্বপ্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং দাবি পূরণে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নীতি গ্রহণ করা হয়। পরিষদের দাবি ছিল- ১. বাংলা ভাষা হবে পূর্ব বাংলার একমাত্র শিক্ষার বাহন ও অফিস-আদালতের প্রধান মাধ্যম ২. গোটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা ও উর্দু। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্র“য়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে কংগ্রেস দলীয় সদস্যরা বিশেষত কুমিল্লার একজন সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি জানান। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এ দাবির বিরোধিতা করেন। ফলে ঢাকায় ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহলে চরম অসন্তোষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। তারপর ২৬ ফেব্র“য়ারি সর্বত্র ধর্মঘট পালিত হয়। সংগ্রাম পরিষদ এভাবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ধর্মঘট ও হরতাল পালনের মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন অব্যাহত রাখে। একপর্যায়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলা ভাষার দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিলে আন্দোলন সাময়িক প্রশমিত হয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালের একুশে মার্চ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানের একটি জনসভায় এবং কার্জন হলের এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পুনরায় ঘোষণা দেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। এ ঘোষণার পর আন্দোলন পুনরায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে এবং দেশব্যাপী তীব্র প্রতিবাদের ঝড় প্রবাহিত হয়। আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫০ ও ১৯৫২ সালে। ১৯৫০ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান নতুন করে ঘোষণা দেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ এতে বাঙালি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং আন্দোলন আরও জোরদার করার শপথ গ্রহণ করে। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন একই ঘোষণার পুনরাবৃত্তি ঘটান। ফলে ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ সব শ্রেণীপেশার মানুষের মাঝে নিদারুণ ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়। আন্দোলনের গতিবেগ ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। এ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৩০ জানুয়ারি ঢাকার রাজপথে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয় এবং জনসভা করা হয়। আন্দোলনকে আরও তীব্র ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ৩০ জানুয়ারি জনসভায় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়। গঠিত কমিটির সভায় ২১ ফেব্র“য়ারিকে ভাষা দিবস হিসেবে পালন এবং দেশব্যাপী হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২১ ফেব্র“য়ারির হরতাল কর্মসূচী বানচাল করার লক্ষ্যে তৎকালীন গভর্ণর নুরুল আমীন সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সরকারের এ অশুভ কর্মকান্ডের দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার জন্য ২০ ফেব্র“য়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্ররা গোপন বৈঠক করে বিদ্ধান্ত নেয়, যে কোনো মূল্যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে। পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২১ ফেব্র“য়ারি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশের আহ্বান করা হয়। সমাবেশ শেষে মিছিল বের হয়। সে দিন ছাত্রসমাজের প্রতিবাদী কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। ক্রমান্বয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। ওই সময় প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন চলছিল ঢাকায়। ভাষার দাবিতে সোচ্চার মিছিলটি জোর কদমে এগিয়ে চলে প্রাদেশিক ভবন অভিমুখে। সে দিন ঢাকায় প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মিছিলকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে একে একে রাজপথে লুটিয়ে পড়ে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর প্রমুখ যুবকরা। বুকের ফিনকিঝরা তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার পিচঢালা কালো পথ। বাংলার মানুষের রক্তের বন্যায় ভেসে যাওয়া কালি দিয়ে লেখা হয় এক অনন্য ইতিহাস। অবশেষে তীব্র বিক্ষোভের মুখে পাকিস্তান সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। সাময়িকভাবে বাংলাকে অন্যতম জাতীয় ভাষা করার প্রস্তাব প্রাদেশিক পরিষদে উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। তারপর সাংবিধানিকভাবে ১৯৫৬ সালে সংবিধানের ২১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়। মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি জাতির চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

ঙ. ‘৫২ এর পথ ধরে আসে স্বাধীনতা: একুশ বাঙালি জাতিকে প্রতিবিন্দু রক্তে জাগরণের জন্ম দিয়েছে। প্রতিষ্ঠা দিয়েছে এর ভাষাকে। এ প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, আন্দোলন ও সংগ্রামের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ১৯৫৪, ’৫৮, ৬২, ৬৬, ৬৯, পার হয়ে আমরা ১৯৭১ সালে ছিনিয়ে এনেছি আমাদের স্বাধীনতা, পেয়েছি মুক্ত স্বদেশ। লাখো শহীদের রক্তে রাঙা হয়ে বাংলাদেশের আকাশে যে লাল সূর্যের আবির্ভাব হয় তার চেতনায় আছে একুশের দান করা রক্তের রং। দেশের বিভিন্ন সময়ে যেসব আন্দোলন হয়েছে তাতে দূর্জয় সাহস, দুর্বার গতি আর অটুট মনোবল সৃষ্টি করেছে মহান একুশে ফেব্র“য়ারি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ যে দূর্বার সাহসের পরিচয় দিয়েছিল এবং অগণিত জীবন উৎসর্গ করেছিল,তার প্রেরণা এসেছিল একুশের চেতনা থেকে। জনৈক ঐতিহাসিক বলেন, “বাহান্ন-এর ২১শে ফেব্র“য়ারী ছিল বাংলাদেশের প্রথম গণ-চেতনার সুসংগঠিত বহিঃপ্রকাশ এবং পরবর্তীকালে শাসকচক্রের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোল্েনর প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।”

চ. একুশের শিক্ষা: একুশ মানে একতাবদ্ধতা। একুশ মানে উন্নততর নৈতিক মূল্যবোধ। একুশ মানে স্বদেশপ্রেম, ভ্রাতৃপ্রেম, মাতৃপ্রেম।
একুশ মানে স্বাধীনতা। একুশ মানে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। একুশের মর্মবাণী বলতে আমরা বুঝি কারও কাছে মাথা নত না করা। একুশের দাবি বলতে আমরা বুঝি জীবনের দাবিকে ঘোষণা করা। একুশের অঙ্গীকার বলতে আমরা বুঝি হৃদয়ের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়া। একুশ মানে হচ্ছে প্রতিপাদ, প্রতিরোধ, আন্দোলন ও সংগ্রাম।

ছ. শেষকথা: ভাষা আন্দোলনের শহিদরা আমাদের অহংকার। তাদেরকে আমরা ভাষার এ মাসে ভক্তিভরে স্বরণ করছি। আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয়; বরং সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলন করে তাদেরকে মূল্যায়ন করতে হবে, বাংলা ভাষার ব্যবহারকে আত্মমর্যাদা ও গর্বের মনে করতে হবে। কোর্ট-কাচারী ও অফিস-আদালতে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার কোনোক্রমেই শোভনীয় নয়। যে ভাষার জন্য রক্ত দেয়া, যে ভাষার জন্য জীবন দেয়া, যে ভাষার জন্য দেশ পাওয়া আসুন সেই ভাষা সৈনিকদের সম্মানের স্বার্থেই সর্বত্র বাংলা ভাষা চালু ও চর্চা করি।

লেখক ও সমাজকর্মী ঃ মো. আব্দুর রাজ্জাক

সহকারি শিক্ষক (কম্পিউটার)

মসজিদ-ই-নূর দাখিল মাদ্রাসা, রাজশাহী।

 



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top