জর্ডান কেন ইসরায়েলের পক্ষে?

রাজ টাইমস ডেস্ক : | প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল ২০২৪ ১৯:১৩; আপডেট: ২৭ মে ২০২৪ ০৮:৫৬

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাত চলছে। এরমধ্যে তেল আবিবে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা। এমন পরিস্থিতে ইরানি ড্রোন-মিসাইল থেকে ইসরায়েলকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের পাশাপাশি কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে জর্ডান। মুসলিম দেশ হয়েও তেল আবিবের পক্ষে জর্ডানের ঢাল হয়ে দাঁড়ানোটা বেশ কৌতুল সৃষ্টি করেছে।

যদিও এক বিবৃতিতে জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, তারা নিজের দেশকে রক্ষার অংশ হিসেবে ইরানের ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ইসরায়েলকে সাহায্য করতে নয়।

পর্যবেক্ষকদের মতে— জর্ডানের ওই বিবৃতি ‘ভারসাম্য রক্ষার’ কৌশল। তাদের কেউ কেউ বলছেন, হামাস, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে সংঘাত চলছে তাতে ‘ক্রসফায়ারে’ পড়তে চায় না জর্ডান।

তবে কূটনৈতিকভাবে জর্ডানের রাজতন্ত্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের। গত ২৫ বছর ধরে জর্ডানের বাদশাহ রয়েছেন দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। পর্দার আড়ালে জর্ডানের সাথে ইসরায়েলের সম্পর্কও একেবারে খারাপ নয়।

এমিলি হোকায়েম পর্যবেক্ষকদের একজন। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এই গবেষক ‘এক্স’ প্লাটফর্মে লিখেছেন, ইরানি ড্রোন ভূপাতিতের মাধ্যমে জর্ডান প্রমাণ করতে চেয়েছে তারা আমেরিকা এবং ইসরায়েলের ভালো সহযোগী।

তবে ভিন্ন যুক্তিও আছে এ ঘটনায়। ভৌগোলিকভাবে জর্ডানের অবস্থান এমন একটি জায়গায় রয়েছে যে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে কোনো যুদ্ধ শুরু হলে সেটির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে জর্ডানের ওপর।

মাসুদ মোস্তাজাবি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ডেপুটি ডিরেক্টর। জর্ডানের এই নাগরিক লিখেছেন, ইরান-ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনা যুদ্ধে রূপ নিলে তেল আবিবের রক্ষাকর্তারাও এক সময় আক্রান্ত হবে। তাদেরও এই যুদ্ধে টেনে আনা হবে।

তিনি লিখেছেন, জর্ডানে বিপুল ফিলিস্তিনি শরণার্থী, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান– এসব কিছুই তাদের জন্য চিন্তার কারণ।

ইসরায়েলে জর্ডানের স্বার্থ কী?

১৯৯৪ সালে জর্ডান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় জর্ডান। ১৯৭৯ সালে মিশর ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর জর্ডান ছিল স্বীকৃতি দানকারী দ্বিতীয় মুসলিম দেশ।

২০২২ সালের নভেম্বরে একটি চুক্তির আওতায় ইসরায়েলের কাছে সৌর বিদ্যুৎ রফতানি করে জর্ডান।

টাইমস অব ইসরায়েলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গেল মার্চ মাসেই পানি চুক্তি নবায়নের জন্য ইসরায়েলকে আহ্বান জানায় জর্ডান। সে সময় ইসরায়েল জর্ডানকে শর্ত দিয়ে বলেছিল, গাজা ইস্যুতে অন্যান্য মুসলিম দেশের মতো শক্ত অবস্থান নেওয়া যাবে না। বরং জর্ডানের অবস্থান নরম করতে হবে।

পর্যবেক্ষকের অনেকেই বলছেন, জর্ডান প্রকৃতপক্ষে একটি ‘চিকন সুতোর’ ওপর দিয়ে হাঁটছে। একদিকে আমেরিকা এবং ইসরায়েলের সাথে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা। কারণ জর্ডানের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ফিলিস্তিনি শরণার্থী।

দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো ঘাইথ আল-ওমারি দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে বলেছেন, বেশ কয়েক বছর ধরে ইরান চেষ্টা করছে জর্ডানের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে। যেমনটা করেছে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন এবং ইয়েমেনের ক্ষেত্রে। এসব দেশে ইরানের এক ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব তৈরি হয়েছে। ফলে এসব দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। ইরান চেষ্টা করছে জর্ডানেও তাদের সে প্রভাব তৈরি করতে।

আল-ওমারি লিখেছেন, ইসরায়েল যদি জর্ডানের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে আক্রমণ করে তাহলে সেটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ইরান জর্ডানেও হামলা করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে জর্ডান চিন্তিত।

১৯৯৪ সালে জর্ডান ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি চুক্তির পর থেকে দুই দেশের মধ্যে শক্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা তৈরি হয়েছে। মুসলিমদের পবিত্র এলাকা আল-আকসা মসজিদ কম্পাউন্ডের মুতওয়াল্লি বা কাস্টোডিয়ান হচ্ছে জর্ডান।

শান্তিচুক্তি অনুযায়ী মাল্টি বিলিয়ন ডলার প্রজেক্টের মাধ্যমে ইসরায়েল জর্ডানে গ্যাস ও পানি সরবরাহ করে। পৃথিবীর যেসব দেশে পানির তীব্র সংকট রয়েছে তার মধ্যে জর্ডান অন্যতম। জর্ডান চারপাশ থেকে স্থল সীমা বেষ্টিত।

ইরানের প্রতিশোধমূলক আক্রমণ থেকে জর্ডান যেভাবে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা করেছে তাতে বেশ খুশি হয়েছে ইসরায়েলিরা। তেল আবিবের সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষণ করলে সে চিত্রই দেখা যায়।

টাইমস অব ইসরায়েলের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইরানের হামলা রুখতে জর্ডান যেভাবে সহায়তা করেছে তাতে অনেক ইসরায়েলিও বিস্মিত হয়েছে। কারণ গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের কড়া সমালোচক হচ্ছে জর্ডান। তারা ইসরায়েলের সাথে কূটনীতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য জর্ডানের সরকার দেশের ভেতরে জনগণের দিক থেকে বেশ চাপের মুখে আছে।

তবে ইসরায়েলের প্রতি জর্ডানের সামরিক সাহায্যের বিষয়টি আকস্মিক কিছু নয় বলে মনে করেন অনেকে।

দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো ঘাইথ আল-ওমারি দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে বলেছেন, জর্ডান যেভাবে ইসরায়েলকে সহায়তা করেছে সেটির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে শক্ত নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।

ইতিহাস কী বলে?

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত মোট চারটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে জর্ডান। ১৯৯৪ সালে জর্ডান এবং ইসরায়েলের মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়।

ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা ‘ইউএন রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি ফর প্যালেস্টাইন রেফিউজিস ইন দ্য নিয়ার ইস্টের হিসাবে মতে— প্রায় ২২ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী জর্ডানে নিবন্ধিত আছে। কিন্তু নিবন্ধনের বাইরেও আরও অনেক ফিলিস্তিনি শরণার্থী জর্ডানে অবস্থান করছে। সবমিলিয়ে এই সংখ্যা ৩০ লাখ কিংবা তার চেয়ে বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

১৯৫১ সালে জর্ডানের তৎকালীন বাদশাহ আবদুল্লাহ জেরুসালেমে আল-আকসা মসজিদে প্রবেশের সময় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একজন ফিলিস্তিনি আরবের বিরুদ্ধে সেই হত্যার অভিযোগ করা হয়। মনে করা হয়, বাদশাহ আবদুল্লাহকে ফিলিস্তিনিদের অনেকেই পছন্দ করতেন না। এর একটি বড় কারণ ছিল প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ফিলিস্তিন নিয়ে তার ভূমিকা।

বলা হয়, শুধু বাদশাহই নয়, ১৯৭১ সালে জর্ডানের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করেছিল ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীরা।

যদিও প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে কয়েকটি প্রতিবেশী আরব দেশের সাথে জর্ডানও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। অবশ্য জর্ডান যুদ্ধে অংশ নিলেও ভেতরে ভেতরে ইসরায়েলের সঙ্গে আঁতাত করে রেখেছিলেন বাদশাহ আবদুল্লাহ।

প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ১৯৫০ সালে জর্ডান তাদের সীমান্তের সাথে ফিলিস্তিনি কিছু ভূখণ্ডকে জর্ডানের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। বাদশাহ আবদুল্লাহর এই পদক্ষেপ পশ্চিমা দেশগুলো সমর্থন দিলেও ফিলিস্তিনিরা সেটি মানতে পারেনি।

বাদশাহ আবদুল্লাহকে হত্যা করার পর মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএর গোপন প্রতিবেদনে তাকে ব্রিটেনপন্থী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তখন সিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাদশাহ আবদুল্লাহর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্টবিরোধী এবং পশ্চিমাপন্থী একজন শাসকের অবসান হলো।

তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে জর্ডানের কোনো আগ্রহ ছিল না। তখন জর্ডানের বাদশা ছিলেন হুসেইন। তার নীতি ছিল আরব জাতীয়তাবাদ এবং ইসরায়েলের সাথে সহাবস্থানের নীতি। যদিও ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল সংকট নিয়ে জর্ডান ইসরায়েলের বিরুদ্ধাচরণ করলেও পরবর্তীতে ইসরায়েলের ব্যাপারে তিনি অনেকটা বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে জর্ডানের বাদশা হুসেইন গোপনে আলোচনা শুরু করেন ইসরায়েলি নেতাদের সাথে।

ইরাকি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ-ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ আভি শ্লেইম ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস ইন দ্য মিডল ইস্ট’ বইতে লিখেছেন, ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল যখন জর্ডানে হামলা চালায় তখন জর্ডানও এই যুদ্ধে জড়িয়ে যায়।

ফিলিস্তিনের ভূমিতে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাদা দুটি রাষ্ট্র গঠনের যে প্রস্তাব জাতিসংঘে উত্থাপিত হয়েছিল সেটিকে একমাত্র আরব দেশ হিসেবে সমর্থন দিয়েছিল জর্ডান। সেটির বিনিময়ে জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ অন্যান্য আরব ভূমি তাদের আওতায় আনতে চেয়েছিলেন।

সেন্টার ফর ইসরায়েল এডুকেশন বলছে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার কিছুদিন আগে তৎকালীন প্রভাবশালী ইহুদি নেতা গোল্ডা মেইর আম্মানে গিয়ে গোপনে বৈঠক করেছিলেন জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সাথে।

প্রথম আরব ইসরায়েল যুদ্ধের পর জর্ডান আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেম দখল করে নেয়। সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনি অধিবাসীদের জর্ডানের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।

সেন্টার ফর ইসরায়েল এডুকেশনের ওয়েব সাইটে বলা হয়েছে, এর আগে ইসরায়েল এবং জর্ডানের মধ্যে বেশ কিছু গোপন বৈঠক হয় যুদ্ধবিরতি নিয়ে। আরব লীগের অন্যান্য দেশ জর্ডানের এসব কর্মকাণ্ড তখন মেনে নিতে পারেনি।

১৯৬৭ সালে তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগ পর্যন্ত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেম জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সে যুদ্ধের পর এসব অঞ্চল ইসরায়েল দখল করে নেয়। এরপর ২০ বছর ধরে জর্ডান চেষ্টা চালিয়েছিল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেম ফেরত পেতে। ১৯৮৮ জর্ডান পশ্চিম তীর থেকে তাদের সেই আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে এবং বিষয়টি প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের ওপর ছেড়ে দেয়। কিন্তু তারা পূর্ব জেরুসালেমের ওপর তাদের প্রভাব বজায় রাখতে চেয়েছিল। তবে তাতে তারা সফল হয়নি।

সূত্র: বিবিসি



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top