আল্লামা সাঈদীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

রাজটাইমস ডেস্ক: | প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫০; আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ ১৩:১১

ছবি: সংগৃহীত

কুরআনের পাখি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ শুক্রবার। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাত ৮টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর পিজি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। চিকিৎসার নামে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ইতিমধ্যে তার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।

বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে মহাগ্রন্থ আল কুরআনের তাফসীর, তথ্যনির্ভর বক্তব্য, ভিন্ন ধারায় চুলচেরা বিশ্লেষণ, সুললিত কন্ঠ, প্রমিত উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি, ভাষার লালিত্য, যুক্তির সহজ প্রয়োগ, প্রাঞ্জল ও সাবলীল উপস্থাপনা, পান্ডিত্বপূর্ণ লেখনী, সমাজসেবা ও সমাজ সংস্কারে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও অবদানের জন্য যিনি স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সমান জনপ্রিয় ছিলেন। ইসলামের ওপর আঘাত আসলে জীবন বাজি রেখে যিনি সিংহের মত বজ্র কন্ঠে গর্জে উঠতেন।

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখ সুবহে সাদিকের সময় পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের সাঈদখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা ইউসুফ সাঈদী দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সুপরিচিত ইসলামী চিন্তাবিদ ও বক্তা ছিলেন। আল্লামা সাঈদী রহ. নিজ পিতার প্রতিষ্ঠিত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করার পর ১৯৬৪ সালে মাদরাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন শেষে গবেষণা কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, মনোবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন মতাদর্শ ও ভাষার ওপর বিশ্লেণধর্মী গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।রাজনীতি সংবাদ বিশ্লেষণ

১৯৬০ সালে আল্লামা সাঈদী রহ. পিরোজপুর জেলার সদর উপজেলার বাদুরা গ্রামের মরহুম ইউনুস আহমেদ-এর তৃতীয় কন্যা বেগম সালেহার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহিত জীবনে আল্লামা সাঈদী ৪ সন্তানের জনক ছিলেন। তারা হলেন- বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মরহুম মাওলানা রাফীক বিন সাঈদী, ইসলামী চিন্তক ও লেখক শামীম বিন সাঈদী, জিয়ানগর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও সমাজসেবক মাসুদ বিন সাঈদী ও গবেষক ও সমাজসেবক নাসিম বিন সাঈদী।

১৯৬৭ থেকে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রহ. দেশ-বিদেশে দাঈ ইলাল্লাহর ভূমিকায় নিরলসভাবে কাজ শুরু করেন এবং এ কাজের ময়দানে ইসলামের শত্রুরা তাকে এ পর্যন্ত ৪ বার হত্যা করার লক্ষ্যে তার প্রতি গুলী ছুড়ে। ২০১০ সালের আগে ১৯৭৫ সালেও তাকে কারাবন্দী করা হয়েছিল।

কিন্তু গ্রেপ্তার, জেল জুলুম নির্যাতন কোনকিছুই আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে কুরআনের দাওয়াত ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার তার মহান মিশন থেকে তাকে বিরত রাখতে পারেনি। ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে তাকে বিরত রাখতে পারেনি।

বরং আল্লাহ তায়ালার ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে অসীম সাহসিকতার সাথে আল্লামা সাঈদী নিজের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে এই দুনিয়ার সফর শেষ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দাঈ ইলাল্লাহর দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন।

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী দীর্ঘ ৫০ বছর পৃথিবীর ৫২টি দেশ ভ্রমণ করে মানুষকে কুরআনের দাওয়াত দিয়েছেন। তার সারা জীবনের স্বপ্নই ছিলো বাংলাদেশে কুরআনের রাজ কায়েম করা। এ দেশের আকাশে কলেমার পতাকা উড়ছে- এই দৃশ্য দেখে আল্লামা সাঈদী দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু তার সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই জালিম আওয়ামী লীগ সরকার আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মিথ্যা মামলায় প্রহসনের রায়ের মাধ্যমে সুদীর্ঘ ১৩টি বছর কারাগারে আটকে রেখে শারীরিক, মানসিকভাবে নির্যাতন করেছে।

বিনা চিকিৎসায় তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আল্লামা সাঈদী দীর্ঘদিন যাবত হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। তার হার্টে ৫টি রিং পড়ানো ছিল। তিনি ছিলেন ৫০ বছরের ডায়াবেটিসের রুগী। এছাড়া আর্থ্রাইটিস, ফ্রোজেন শোল্ডারসহ আরো কিছু জটিল রোগে তিনি আক্রান্ত ছিলেন।বাংলাদেশ সংবাদ

১৩ আগস্ট ২০২৩, রোববার, সকালে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। তাৎক্ষণিক তিনি কারা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করলে তারা কারাগারের ফার্মাসিস্ট দিয়ে তার ব্লাড প্রেশার ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা তা চেক করে চলে যায়।

ব্যথার তীব্রতা বাড়তে থাকায় আসরের নামাযের পর কারা কর্তৃপক্ষ আল্লামা সাঈদীকে কাশিমপুর কারাগার থেকে প্রথমে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে।

সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে ইসিজিসহ কিছু পরীক্ষা শেষে তাকে ঢাকার শাহবাগস্থ বিএসএমএমইউ-তে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) পাঠানো হয়। মাগরিবের নামাযের পর রওয়ানা করিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ সিসিইউ সাপোর্টহীন একটি এম্বুলেন্সে আল্লামা সাঈদীকে বিএসএমএমইউ-তে নিয়ে আসে রাত ১১টার দিকে।

এরপর আল্লামা সাঈদীকে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ তাদের হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে আল্লামা সাঈদীর একটি ইসিজি শেষে করোনারী কেয়ার ইউনিটে (সিসিইিউ) নিয়ে যায়।

পরদিন ১৪ আগস্ট ২০২৩, সোমবার, চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী সন্ধ্যা ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে আল্লামা সাঈদীর সাডেন কার্ডিয়াক এরেস্ট হয়। তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। রাত ৮টা ৪০ মিনিটে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লামা সাঈদী দুনিয়ার সফর শেষ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিঊন।

১৯৬৭ সাল থেকে তিনি দায়ী ইলাল্লাহ হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাইদী পৃথিবীর অর্ধশতকেরও বেশি দেশে আমন্ত্রিত হয়ে ইসলামের সু-মহান আদর্শ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। দেশে বিদেশে ৫০ বছরের ইসলাম প্রচারের ময়দানে ছিলেন আল্লামা সাঈদী।

চট্টগ্রাম প্যারেডগ্রাউন্ড ময়দানে প্রতি বছর ৫ দিন করে দীর্ঘ ২৯ বছর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় । পবিত্র কাবা শরীফের সম্মানিত ইমাম এ মাহফিলে দু’বার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দানসহ শহরের বিভিন্ন মাঠে প্রতি বছর ২ দিন করে দীর্ঘ ৩৮ বছর তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট সরকারী আলীয়া মাদরাসা মাঠে প্রতিবছর ৩ দিন করে দীর্ঘ ৩৩ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহী সরকারী মাদরাসা মাঠে প্রতি বছর ৩ দিন করে দীর্ঘ ৩৫ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

বগুড়া শহরে প্রতি বছর ২দিন করে দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে ময়দান ও পল্টন ময়দানে প্রতি বছর ৩ দিন করে দীর্ঘ ৩৪ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে তিনদিনব্যাপী প্রায় দীর্ঘ ৩১ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রহ. ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮২ সালে জামায়াতের রুকন হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি জামায়াতের মজলিসে শূরা সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯৬ সালে তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ১৯৯৮ সালে জামায়াতের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। আল্লামা সাঈদী ২০০৯ সাল থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জামায়াতের নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৭৬ সাল থেকে সৌদির আমন্ত্রণে রাজকীয় মেহমান হিসেবে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী হজ্জব্রত পালন করে আসছেন। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর রমযান মাস মক্কা মদীনায় থাকা তার রুটিন হয়ে গিয়েছিল।

১৯৮২ সালে ইমাম সৈয়দ আলী হোসেনী খমিনির আমন্ত্রণে ইরানের প্রথম বিপ্লব বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তেহরান সফর করেন। ১৯৯১ সালে সৌদি বাদশার আমন্ত্রণে কুয়েত ইরাক যুদ্ধের মীমাংসা বৈঠকে তিনি যোগদান করেন। ১৯৯১ সালে ইসলামী সার্কেল অফ নর্থ অ্যামেরিকা তাকে “আল্লামা” খেতাবে ভূষিত করে। 

১৯৯৩ সালে নিউইয়ার্কে জাতিসঙ্ঘের সামনে অ্যামেরিকান মুসলিম ডে প্যারেড সম্মেলনে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে “গ্র্যান্ডমার্শাল” পদক দেয়া হয়। দুবাই সরকারের আমন্ত্রণে ২০০০ সালের ৮ই ডিসেম্বর আরব আমিরাতে ৫০,০০০ হাজারেরও বেশি শ্রোতার সামনে তিনি কুরআনের তাফসির পেশ করেন ।

লন্ডন মুসলিম সেন্টারের উদ্বোধনি অনুষ্ঠানে কাবা শরিফের সম্মানিত ইমাম “শায়েখ আব্দুর রাহমান আস সুদাইসির” সাথে মাওলানা সাঈদীও আমন্ত্রিত হন । মাওলানা সাঈদীর হাতে হাত রেখে ছয় শতাধিক অমুসলিম ভাই-বোন ইসলামের সুমহান আদর্শে দিক্ষিত হন।

কুরআনের সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রহ. যে বক্তব্য রেখেছেন- তার সিডি, ভিসিডি, ডিভিডি, অডিও-ভিডিও সমগ্র পৃথিবীতেই পাওয়া যায়। তার পাণ্ডিত্যসুলভ আলোচনা ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিপূর্ণ বক্তৃতায় আকৃষ্ট হয়ে এ পর্যন্ত সহস্রাধিক অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়েছেন। আমেরিকার এটর্নী অব ল, যোশেফ গ্রোয়ে এর মধ্যে অন্যতম।

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসন থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পরপর দু’বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাকে পরিকল্পিতভাবে হারিয়ে দেয়া হয়। তিনি মাত্র ৬,৯৯৬ ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন।বাংলাদেশ সংবাদ

২০০১ সালে তিনি ১,১০,১০৮ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী শ্রী সুধাংশু শেখর হালদার ৭৬,৭৩১ ভোট পেয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে সারাদেশে জামায়াতে ইসলামীর মাত্র তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে আল্লামা সাঈদী ৫৫,৭১৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী শ্রী সুধাংশু শেখর হালদার পেয়েছিলেন ৫৫,৪৩৭ ভোট।

২০০১ সালে জোট সরকারের আমলে আল্লামা সাঈদী রহ. সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পিরোজপুর-১ সংসদীয় এলাকার ইন্দুরকানীকে তিনি জিয়ানগর নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি উপজেলায় পরিণত করেছিলেন।

আল্লামা সাঈদী জিয়ানগর উপজেলার সকল ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, ব্রীজ-কালভার্ট, হাসপাতাল সবকিছুই নির্মাণ করেন। পিরোজপুর-১ আসনের অভূতপূর্ব উন্নয়নের জন্য আল্লামা সাঈদীকে পিরোজপুরের উন্নয়নের রূপকার বলা হয়ে থাকে।



বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top