সিনহা হত্যা: কী হবে ৩১ জানুয়ারি

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ৩০ জানুয়ারী ২০২২ ০০:২৫; আপডেট: ১ ডিসেম্বর ২০২২ ০৯:৫৮

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার শুনানি শেষ হয়েছে গত ১২ জানুয়ারি। যুক্তিতর্ক শেষে ৩১ জানুয়ারি রায়ের জন্য দিন ধার্য করেছেন জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাঈল।

এরপর থেকে কেবল দিনটির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিশেষ করে প্রদীপের অপশাসনে ক্ষতিগ্রস্ত টেকনাফবাসীর প্রতীক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না। সিনহা হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপসহ ১৫ আসামির কী সাজা হবে তা নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই জনমনে।

টেকনাফ থানার ওসি থাকাকালে প্রদীপের রোষানলে ক্ষতিগ্রস্ত শত শত পরিবারের চাওয়া একটাই- প্রদীপ ও তার সহযোগীদের যেন ফাঁসি হয়। রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের পর থেকেই বিশেষ প্রার্থনা করছেন ভুক্তভোগীরা।

তবে, মামলার বাদি নিহত সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসের কামনা- প্রধান দুই আসামি প্রদীপ-লিয়াকতের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা হবে। বাকি আসামিদের সাজা হোক অপরাধের ভিত্তিতে। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও বন্ধ হবে বলে তিনি আশা করেন। অপরাধী যেই হোক না কেন, অপরাধ করলে কেউ আইন ও সাজার হাত থেকে রেহাই পায় না-এ রায়ের মাধ্যমে সেটিই প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তার প্রত্যাশা।

সূত্র মতে, প্রদীপ কুমার দাশ টেকনাফ থানার ওসি থাকাকালে মাদক নির্মূলের নামে ২২ মাসে ১৪৪টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার জন্ম দেন। তাতে মারা গেছেন ২০৪ জন। নিহত সবাইকে দেওয়া হয়েছে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের তকমা। অথচ সাধারণ মানুষ বলছে, ক্রসফায়ারে নিহতদের বেশিরভাগই ছিল নিরীহ। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের সন্ত্রাসী তাকমা দিয়ে একই পরিবারের তিন ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করার অভিযোগ আছে প্রদীপের বিরুদ্ধে।

এ পরিবারের সদস্য মুহাম্মদ আলম বলেন, ‘খুনের শিকার’ তিন ভাইয়ের বউ এবং এতিম সন্তানেরা কামনা করছে তাদের অভিভাবকদের হত্যায় জড়িত ওসি প্রদীপ ও অন্যদের যেন ফাঁসি হয়। এ জন্য তারা প্রতি সোম ও শুক্রবার রোজা রেখে বিশেষ প্রার্থনা করছেন। তাদের প্রতিপক্ষের সঙ্গে চুক্তি করে তার তিন ভাইকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে জড়িতের বেশ কয়েকজন সিনহা হত্যা মামলায় আসামি হয়ে কারাগারে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

টেকনাফের ওসি থাকাকালীন তার দুই মেয়েকে প্রদীপ ধর্ষণ করেছে দাবি করে এক নারী জানান, মেজর সিনহা হত্যার রায়ের দিন নির্ধারিত হওয়ার পর থেকে প্রদীপের যেন ফাঁসি হয় এজন্য তিনিও রোজা রাখছেন। ধর্ষণের ঘটনায় আদালতে মামলা করলেও এখনো মামলার কোনো কূলকিনারা হয়নি বলে উল্লেখ করেন এই নারী।

টেকনাফ হোয়াইক্যংয়ের বাসিন্দা জাহেদুল ইসলাম জানান, মাদকের তকমা দিয়ে তার এলাকায় প্রদীপ ১৬ জনকে হত্যা করেছে। হত্যার শিকার প্রায় সবাই নিরীহ ও নিতান্তই গরিব। এসব পরিবারের সদস্যরা এখন প্রদীপের ফাঁসির কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করছেন।

প্রদীপের অপকর্মের সংবাদ প্রচার করায় মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের শিকার হন কক্সবাজারের সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খান। তিনি বলেন, কয়েকশ’ পরিবারকে নির্যাতন করেছে প্রদীপ ও তার সহযোগীরা। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করায় আমাকে ঢাকা থেকে ধরে এনে অস্ত্র, মদ ও ইয়াবা দিয়ে চালান দেওয়া হয়। এর আগে চালানো হয় মধ্যযুগীয় নির্যাতন। চোখে দেওয়া হয় মরিচের গুড়া। মেজর সিনহা হত্যার মধ্যদিয়ে টেকনাফে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করিয়েছে আল্লাহপাক। সিনহা হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে। আমরা চাই তার সর্বোচ্চ শাস্তি হোক।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে টেকনাফ থানায় দুটি এবং রামু থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং মাদক আইনে এসব মামলা দায়ের হয়। টেকনাফ থানায় দায়ের করা দুই মামলায় নিহত সিনহার সঙ্গী সাইদুল ইসলাম সিফাতকে আসামি করা হয়। আর রামু থানায় মাদক আইনে দায়ের করা মামলাটিতে আসামি করা হয় নিহত সিনহার অপর সফরসঙ্গী শিপ্রা দেবনাথকে।

২০২০ সালের ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদি হয়ে ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কক্সবাজার আদালতে মামলা দায়ের করেন। এতে প্রধান আসামি করা হয় টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সাবেক ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে। মামলার অন্য আসামিরা হল, টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আব্দুল্লাহ আল মামুন, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, উপ-পরিদর্শক (এসআই) টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা।

মামলাটি টেকনাফ থানায় নথিভুক্ত করার পর আদালত তদন্তভার দেন র্যা বকে। একই সঙ্গে পুলিশের দায়ের করা মামলা তিনটিও র্যাবকে তদন্ত করার আদেশ দেয় আদালত।

২০২০ সালের ৬ আগস্ট সকালে মামলাটি টেকনাফ থানায় নথিভুক্ত করে তদন্তের জন্য র্যাবকে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিন বিকালে মামলায় অভিযুক্ত ৯ জনের মধ্যে ৭ পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। ওইদিন পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল- এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা নামের কোনো পুলিশ সদস্য জেলা পুলিশে কর্মরত ছিল না। ওইদিনই আত্মসমর্পণকারী আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর র্যাব-১৩ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) খাইরুল ইসলাম ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযুক্তদের মধ্যে ১৪ জন কারাগারে থাকলেও টেকনাফ থানার কনস্টেবল সাগর দেব পলাতক ছিল। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৮৩ জনকে। একই দিন পুলিশের দায়ের করা মামলা তিনটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করে পলাতক আসামি কনস্টেবল সাগর দেবের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। সেই সাথে পুলিশের দায়ের তিনটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলা থেকে সাইদুল ইসলাম সিফাত ও শিগ্রা দেবনাথকে মামলা থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন আদালত।

এরপর মামলাটি জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহর আদালত থেকে মামলাটির কার্যক্রম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনের আদালতে স্থানান্তর করা হয়। ২০২১ সালের ২৪ জুন পলাতক আসামি কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এতে আদালত ওইদিনই তাকে কারাগারে প্রেরণ করার আদেশ দেন।

২০২১ সালের ২৭ জুন আদালত ১৫ আসামির বিরুদ্ধে বিচারকাজ শুরুর আদেশ দেন। সেই সাথে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ২৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত দিন ধার্য করেন। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে আদালতের বিচার কার্যক্রম স্থগিত থাকায় ধার্য দিনগুলোতে সাক্ষ্য গ্রহণ সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৩ আগস্ট থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ দফায় ৮৩ জনের মধ্যে ৬৫ জন সাক্ষ্য প্রদান করেন। যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের শেষ দিনে আদালত ৩১ জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।

এছাড়া মেজর সিনহা নিহতের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। গঠিত কমিটি তদন্ত শেষে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। তবে ওই তদন্ত প্রতিবেদনে কি ছিল তা প্রকাশ পায়নি।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম বলেন, ৩১ জানুয়ারি সিনহা হত্যা মামলার রায় প্রকাশ করা হবে। আমরা তার হত্যার বিষয়টি প্রমাণে সক্ষম হয়েছি। আমাদের আশা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবেন ওসি প্রদীপ ও অভিযুক্তরা।

তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top