স্পিরুলিনা চাষ বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা কেন সফল হল না

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০১:৫৪; আপডেট: ১ ডিসেম্বর ২০২২ ০৯:০১

শুকনা স্পিরুলিনা। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার সায়েন্স ল্যাবেরটরি মোড় বলে পরিচিত এলাকাটিতে ফুটপাতে এক সমায় সবুজাভ এক ধরণের শরবৎ কিনতে পাওয়া যেত। সেই শরবৎ বিক্রেতারা উচ্চস্বরে শরবতের নানা গুণের কথা বলতেন। পাশেই বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের সদর দপ্তরের মূল ফটকের কাছে একটি বিক্রয়কেন্দ্রে সরকারি উদ্যোগে বিক্রি করা হত স্পিরুলিনা নামে এক সামুদ্রিক শৈবালের গুড়া। সেই গুড়া থেকেই তৈরি সবুজাভ ওই শরবৎ।

স্পিরুলিনাতে রয়েছে প্রায় ডিমের সমান পুষ্টিগুণ। তাই একে 'সুপারফুড' বলেও বর্ণনা করেন অনেকে।

উচ্চ খাদ্যগুণের কারণে বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে স্পিরুলিনার চাষ ছড়িয়ে দেয়ার ও জনপ্রিয় করার চেষ্টা হয়। কিন্তু এই চেষ্টা সফল হয়নি।

গবেষকদের বর্ণনায়, পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল এই ব্যর্থতার পেছনে কারণ।

স্পিরুলিনা কী?
এক প্রকার বহুকোষী নীলাভ সবুজ শৈবাল। উষ্ণ-ক্ষারীয় পানিতে জন্মানো অতিক্ষুদ্র এই শৈবালকে পৃথিবীর প্রাচীণতম জীবিত বস্তুগুলোর একটি বলে মনে করা হয়।

বাহ্যিক গঠন সর্পিলাকার হওয়ায় ল্যাটিন শব্দ spira হতে এর নামকরণ হয় spirulina যার অর্থ হচ্ছে পাকানো বা সর্পিলাকার।

সামুদ্রিক শৈবাল হিসেবে পরিচিত এই সুপারফুড স্পিরুলিনা বর্তমানে কৃত্রিম জলাধারে উৎপাদিত হচ্ছে।

স্পিরুলিনার খাদ্যগুণ
গবেষকদের মতে , ১০০ গ্রাম স্পিরুলিনায় ৩৭৪ কিলোক্যালরি শক্তি রয়েছে। ১০০ গ্রাম স্পিরুলিনার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই প্রোটিন। এ ছাড়া এতে উচ্চমাত্রায় লৌহ, পটাশিয়াম, জিংক ও ক্যালসিয়াম রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, ১০০ গ্রাম স্পিরুলিনায় ৫৮২ গ্রাম কলিজার সমপরিমাণ লৌহ, তিনটি কলার সমপরিমাণ পটাশিয়াম, ৩৭৭ গ্রাম শাকের সমপরিমাণ জিংক ও ১১০ মিলিলিটার দুধের সমপরিমাণ ক্যালসিয়াম রয়েছে।

ফলে ২০০৮ সালে বিভিন্ন দেশের পুষ্টিহীনতা দূর করতে জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক প্রতিবেদনেও স্পিরুলিনা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। গবেষকরা বলছেন এই স্পিরুলিনা শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই খেতে পারেন।

"এটা কোন মেডিসিন না। এটা একটা সাপ্লিমেন্টারী ফুড। এটার কোন স্বাদ নেই। যেকোন খাবার সঙ্গে এটা খাওয়া যায়" বলছিলেন ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এএফএম জামাল উদ্দিন। তিনি স্পিরুলিনা নিয়ে গবেষণা করছেন।

স্পিরুলিনার গুড়া, ট্যাবলেট,কাপসুল আকারে পাওয়া যায়। ডায়েবিটিস, বার্ধক্যজনিত রোগ, রক্তশূন্যতা প্রতিবন্ধীও গর্ভবতী মায়েদের জন্য স্পিরুলিনা খুবই কার্যকরি।

এছাড়াও স্পিরুলিনা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে,মস্তিষ্কের শক্তি বাড়ায়, হজম ক্ষমতা বাড়ায় ও রক্তের শর্করা কমাতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশে স্পিরুলিনা চাষ সফল না কেন
আশির দশকে বাংলাদেশ কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের তত্ত্বাবধানে স্পিরুলিনা চাষ শুরু হয়। তবে স্পিরুলিনা চাষ তখন টেকসই হয়নি। এর কারণ অনুসন্ধান করে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয়টির একদল গবেষক স্পিরুলিনা চাষ উদ্যোগ অসফল হওয়ার পিছনে পদ্ধতিগত ত্রুটির কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এএফএম জামাল উদ্দিন বলেন সেসময় এই শৈবাল তৈরির জন্য উন্মুক্ত স্থান যেমন সুইমিং পুল বা এই ধরণের কংক্রিটের খোলা স্থানে করা হয়।

ফলে দেখা যায় সেখানে গাছের পাতা, মশা, মাছি, মরা ইঁদুর, ধুলা এমনকি সাপ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। ফলে এই শৈবালের যে গুনাগুণ তা নষ্ট হয়। এছাড়া মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতেও ব্যর্থ হয় কর্তৃপক্ষ।

তবে বাংলাদেশে স্পিরুলিনা চাষ ব্যর্থ হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণের কথা বলেন দিনাজপুরের কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মাহাবুবুর রশীদ। তিনি কুড়িগ্রামে ফুলপুরে কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে স্পিরুলিনা চাষ করেন।

তিনি বলেন এটার প্রডাকশন প্রক্রিয়া বেশ কঠিন। তিনি তুলনা দিয়ে বলেন, "মাশরুম চাষ তুলনামূলক অনেক সহজ সেটাই সফল করা যায়নি। সেখানে স্পিরুলিনা অনেক কঠিন"।

"সামুদ্রিক স্পিরুলিনা যদি সঠিক প্রক্রিয়ায় বাজারজাত করা হয় তাহলে মানুষ উপকার পেতে পারেন। তবে এখানে পানি থেকে শুরু করে সব কিছুই অনেক নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখতে হয়"।

"আয়ুর্বেদ এবং কসমেটিক পণ্যে এটার চাহিদা থাকে। তারা যদি দেখে বাংলাদেশে যেগুলো তৈরি হচ্ছে তার কোয়ালিটি বিদেশে বা প্রাকৃতিক চাষের মত না, তাহলে তারা সেটা নেয় না। ল্যাব, প্যাকেজিং, বাজারজাত, প্রডাকশন হাউসের হাইজিনের সার্টিফিকেট নিতে হয়। এটা কেউ করে না। তাই ক্রেতার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়। যার ফলে বাণিজ্যিক ভাবে এটা আলোর মুখ দেখে না" বলেন মি. রশীদ।

স্পিরুলিনার আধুনিক চাষ পদ্ধতি
২০১৮ সালের শুরুর দিক থেকে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এফএমজামাল উদ্দিন।

আধুনিক এই পদ্ধতিতে মুখবন্ধ স্বচ্ছ বালতিতে স্পিরুলিনার চাষ করা হয়।

সাদা ড্রাম বা কন্টেইনার পাইপের মাধ্যমে একটির সাথে অন্যটি সংযুক্ত।

ড্রামের ভেতরের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে নানা উপাদান মিশ্রিত পানির দ্রবণ।

যেখানে সমুদ্রের পানির মত ড্রামের ভেতরের পানি চলমান রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ব্লোয়ার মেশিন। আর এর মধ্যেই উৎপাদিত হচ্ছে স্পিরুলনা।

ড. উদ্দিন বলেন, "আমরা চার ফুট উচ্চতা ও তিন ফুট ব্যাসসম্পন্ন ৯৬টি ফুডগ্রেডেড ড্রাম ব্যবহার করেছি। প্রতিটি ড্রামে ২৫০ লিটার পানিতে সোডিয়াম বাইকার্বোনেট, ইউরিয়া, মিউরেট অব পটাশ (এমওপি), ম্যাগনেসিয়াম সালফেট নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে দ্রবণ প্রস্তুত করেছি। এই দ্রবণ থেকে স্পিরুলিনা প্রয়োজনীয় সব খাদ্য নিতে পারবে"।

সূত্র: বিবিসি বাংলা



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top