ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে মুখোরিত শতবর্ষী সাহেব বাজার বড় মসজিদ

মহিব্বুল আরেফিন | প্রকাশিত: ৯ জানুয়ারী ২০২২ ১৮:৫৬; আপডেট: ১০ জানুয়ারী ২০২২ ০০:২৬

ঐতিহ্যবাহী সাহেব বাজার বড় মসজিদের পুরানো ছবি বামে।  যা ১৯ শতকে মুঘোল প্যাটে নির্মিত হয়। ডানে বর্তমান নব নির্মিত সৃদৃশ্য মসজিদ।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে আল্লাহু আকবার ধ্বনীতে মুখোরিত শতবর্ষী সাহেব বাজার বড় মসজিদ। রাজশাহী নগরীর প্রাণকেন্দ্র সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে ঐতিহ্যবাসী মসজিদটির অবস্থান হবার কারণে নগরবাসীর কাছে আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। এককালে মসজিদটি নিশ্চিহ্ন হবার উপক্রম হলেও বর্তমানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আর কুরআন তেলওয়াতের স্বর্গীয় আমেজে মুখোরিত মুসল্লিদের হৃদয়।

ঐতিহাসিক জনশ্রুতি
মসজিদটি নিয়ে বেশ কিছু কিংবদন্তী চালু রয়েছে। অনেকের মতে ১৯২১ সালের পূর্বে এখানে তিনটি গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ ছিলো। কিন্তু সেখানে একটি মেহরাব ছাড়া অন্য চিহ্ন গুলো ধ্বংশ হয়ে যায়। কারো কারো মতে মেহরাবটি কুঠিয়ালদের টাওয়ার (Tower) ছিলো। তবে সাহেব বাজার বড় মসজিদের প্রথম দিকের অবকাঠামো নির্মাণ সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় না। গবেষকদের ধারণা, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মসজিদটি নির্মাণ হয়।

কিংবদন্তী আছে, বর্তমান মসজিদ চত্তরের কোন এক স্থানে তিনটি বট গাছ ছিল। আর এ বটগাছের গোড়ায় পেরেক বিশিষ্ট দোলনায় কতিপয় সন্ন্যাসী উলঙ্গ আবার কখনও কৌপিন পরে শুয়ে বা অবস্থায় করতেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে রাজশাহী শহর হিন্দু প্রধান হয়ে উঠে। ফলে পর্যায় ক্রমে মসুলমানরা সংখ্যা লঘু হয়ে যায়। ফলে মসজিদটিতে মুসল্লিদের সমাগম কমতে থাকে। এক সময় অযত্নের কারণে মসজিদটি নিশ্চিহ্ন হবার উপক্রম হয়ে পড়ে। এদিকে মসজিদটি গম্বুজ বিশিষ্ট হবার কারণে ধ্বংশ প্রাপ্ত মসজিদটিতে অনেকেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ বলে দাবি করা শুরু করেন। এরপরেও ১৯১০-১২ সালের দিকে এই মসজিদটি অস্তিত্ব অম্লান ছিলো। আর একটি মাত্র মেহরাব থেকে মসজিদটির পুনরায় নির্মাণ সম্ভব হয়।

ঐতিহাসিক রায়
সাধক সদাই ফকিরের শিষ্য মরহুম খোঁয়াজ আহমদ ধ্বংশ প্রাপ্ত মসজিদটির মেহরাবকে কেন্দ্র করে ১৯২১ সালে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহন করেন। এসময় তিনি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়, জেলা বোর্ড ও মিউনিসিপ্যালিটি কর্তৃকহয়রানী ও বাঁধাপ্রাপ্ত হন। এমন কি এ ঘটনার জের ধরে খোঁয়াজ আহমদ দুই মাস কারা ভোগ করেন।

পরবর্তীতে ১৯২৩ সালে রাজশাহী সদর মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট সরেজমিন তদন্ত করে মসজিদ পুণঃনির্মাণের রায় দেন। আর রাজশাহী কালেক্টরের মহাফেজখানায় (রেকর্ড রুম) রক্ষিত ১৮৪৯ সালের একটি সার্ভে নকশাতে এখানে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের নকশা আছে। যার দাগ নং-১৫১। ১৬শ গজের ৮ বিঘা জমির উপর এর চৌহদ্দী নির্দিষ্ট ছিল। এমন কি হিন্দু রঞ্জিকা পত্রিকায় মসজিদটির কথা উল্লেখ আছে।
রাজশাহী সদর মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট এর সরেজমিন তদন্ত নিয়ে চমকপ্রদ একটি ঘটনা রয়েছে। বর্ননা থেকে জানা যায়, বিবাদমান মসজিদটির তদন্তের জন্য সরেজমিনে ম্যাজিস্ট্রেট আগমন করেন। এসময় স্থানীয় হিন্দু এবং মুসলিম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সাথে আলাপ করতে করতে মসজিদটির ভেতর প্রবেশ করেন। এসময় উপস্থিত মসুলমানরা খড়ম বা চপ্পল খুলে প্রবেশ করেন আর হিন্দুরা খড়ম বা চপ্পল পরে মসজিদটির ভেতর প্রবেশ করেন। এসময় ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত সকলে সামনে ঘোষনা করেন এই স্থাপনাটি মসজিদ ছিলো। এসময় হিন্দু কর্তা ব্যক্তিরা বলে উঠে এটা কিভাবে সম্ভব। ম্যাজিস্ট্রেট বলে উঠেন এটা যদি হিন্দুদের উপশনা গৃহ হতো তবে আপনারা চপ্পল পরে ভেতরে আসতেন না। যেহুতু এটা মসুলমানদের উপশনা গৃহ তাই তারা ঠিকই সম্মান জানিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে। এর পরে ম্যাজিস্ট্রেট ফিরে আসেন। ঘটনার পর্যবেক্ষন এবং ১৮৪৯ সালের সার্ভে নকশার উপর ভিত্তি করে তিনি এটি মসজিদ ছিলো বলে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। উল্লেখ্য তদন্তের সময় মসজিদ পূর্ণ কোন অবকাঠামো ছিলোনা বলে জানা যায়।

মসজিদ নির্মাণ শৈলী
মসজিদটি মুঘোল প্যাটার্নে তৈরি হলেও আধুনিক কারুকার্যের কারণে উত্তর বাংলার প্রথম আধুনিক ডিজাইনের মসজিদ হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯২৭ সালে মসজিদটির দ্বিতীয় বার ভিত্তি স্থাপন হয় এবং পূর্ণ আকৃতি পায় ১৯৫৪ সালে। এসময় ভারতের মধ্য প্রদেশের কোন এক মসজিদের অনুকরণে সাহেব বাজার মসজিদটির ডিজাইন তৈরি করা হয়।

তথ্য উপাত্ব থেকে জানা যায়, মসজিদটির নির্মাণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ আব্দুল হাকিম কোরায়েশী ও জনৈক আমির আলী প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাহেব বাজার বড় মসজিদ রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমান সময় তৃতীয় বার নির্মিত হয়। মসজিদটি পুনরায় নির্মাণের সময় সড়ক ও জনপথকে মসজিদের সামনের রাস্তাটি ছেড়ে দেয়া হয়। তবে রাস্তাটি সচল রেখেই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদ কমপ্লেক্সে এমন প্যাটার্নে নির্মাণ হয়েছে যাতে রাস্তাও আছে, আবার রাস্তার উপরিভাগে ভবনও নির্মিত হয়েছে। এ জন্য ৭.৯২ শতক জায়গা ছেড়ে নির্মাণ করা হয় ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোর।

সাবেক মেয়র মো. মিজানুর রহমান মিনুর মেয়াদকালে প্রায় ৩ কোটি টাকার গৃহীত প্রকল্পে ৪ তলা ভিত্তির উপর তিন তলা পযর্ন্ত নির্মিত হয় সাহেব বাজার বড় মসজিদ। তবুও বাইরের অংশসহ আরো অনেক কাজ কাজ অসমাপ্ত থাকে। পরবর্তী ২০০৮ সালে বর্তমান মেয়ের এ.এইচ.এম. খায়রম্নজ্জামান লিটন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি মসজিদটির অবশিষ্ট কাজ শেষে করার জন্য নতুন প্রকল্প গ্রহন করেন। ২০১১-১২ অর্থ বছরে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যায়ে প্রকল্পটির কাজ বাস্তবায়ন শুরু হয়। ২০১২ সালের ১০ মে ৪র্থ তলা নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন তিনি।

১৫ দশমিক ৬০ শতক জমির উপর পুনঃনির্মিত মসজিদটিতে ৪টি ফ্লোর রয়েছে। যাতে একসাথে ৩ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদ ভবনের উত্তর ও দক্ষিণে দুটি সিঁড়িসহ ৪ টি ওজুখানা, ১টি গ্রন্থাগার এবং ইমাম ও মুয়াজ্জিনের থাকার ব্যবস্থা। ৪ গম্বুজ ও ১টি মিনার সম্বলিত মসজিদের গ্রাউন্ড ফ্লোরের আয়তন ২ হাজার ৫০০ বর্গফুট। ২য়, ৩য় ও ৪র্থ প্রতি ফ্লোরের আয়তন ৪ হাজার ৫০০ বর্গফুট। মসজিদের প্রধান দরজার পাশে অন্যান্য দিকে দোকান নির্মাণ রয়েছ।

দৃষ্টি নন্দন আধুনিক নির্মাণশৈলীতে গড়া সাহেব বাজার মসজিদটি ভ্রাম্যমান দোকানপাটেই সৌন্দর্য ম্লান হয়ে গেছ- ছবি সৌরভ

দোকানপাটেই সৌন্দর্য ম্লান
দৃষ্টি নন্দন আধুনিক নির্মাণশৈলীতে গড়া সাহেব বাজার মসজিদটি ভ্রাম্যমান দোকানপাটেই সৌন্দর্য ম্লান হয়ে গেছে। মসজিদটির চার পাশে দৃষ্টি দিলেই সহজেই তা চোখে পড়ে। মসজিদ চত্বর ঘিরে রয়েছে চা ষ্টল, ভাজা পোড়া থেকে শুরু করে অসংখ্য দোকানপাট। মসজিদের সামনের চত্বও যেন দখলদারদের অভায়ারণ্য।

সরজমিনে দেখা যায়, কেউ খুলে বসেছেন চায়ের স্টল, কেউ পান সিগারেটের দোকান। আরও রয়েছে ডাব, বিভিন্ন ফলমূল ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের যত্রতত্র দোকান পাট। এছাড়া মসজিদ কমপ্লেক্সের নিচের মার্কেটে সব ওষুধের দোকান। যা শৃঙ্খলা এবং সুষ্ঠ ভাবে পরিচালনা হলেও বিপত্তি ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট নিয়ে। অথচ সিটি করপোরেশন কিংবা মসজিদ কমিটির এ বিষয়ে কোন ভ্রƒক্ষেপ নেই। সৌন্দর্য, নির্মাণশৈলী ও মুসল্লিদের সুবিধার দিক থেকে রাজশাহী মহানগরীর সর্বাধুনিক মসজিদ হচ্ছে এটি। দূর থেকে মসজিদটির রূপ বিমোহিত করলেও কাছে গেলে হতাশ হতে হয়।
মসজিদের মুসল্লিরা জানান, পরিপাটি সুন্দর মসজিদের প্রবেশের শুরুতেই যত্রতত্র দোকানপাটের জন্য বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তারা অনতিলম্বে মসজিদের সুদৃশ্য সীমানা প্রাচীর নির্মাণের দাবি জানান।



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top