মানব মূত্র বর্জ্য নয়, সম্পদ

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২২ ১৭:৫০; আপডেট: ২৮ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:২৯

মূত্র বর্জ্য নয়, সম্পদ। ছবি: সংগৃহীত

ড. মইনুল হাসান: অনেকদিন থেকেই বিজ্ঞানীরা এ কথা বলে আসছেন। মানুষসহ অন্যান্য অনেক প্রাণীর দেহে রেচন প্রক্রিয়ায় শরীর থেকে বর্জ্য-বিষাক্ত জৈব, অজৈব পদার্থ এই মূত্র বা প্রস্রাবের মাধ্যমে নির্গত হয় এবং রক্তকে পরিশুদ্ধ করে। স্বল্প অম্লধর্মী ও সামান্য হলুদ বা বর্ণহীন এই তরলের ৯৫ শতাংশ পানি আর বাকি ৫ শতাংশ হচ্ছে বর্জ্য।

বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি এই ৫ শতাংশ বর্জ্যরে দিকে। কারণ এতে রয়েছে রাসায়নিক সারের প্রধান তিনটি উপাদান— নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাসিয়াম। চাষাবাদের জন্য জমির উর্বরতা বাড়াতে শিল্প উৎপাদিত রাসায়নিক বা খনিজ সারের চমৎকার বিকল্প হতে পারে মানব মূত্র। সম্প্রতি মানুষের কল্যাণে এমন তরল ব্যবহারের জন্য গবেষক-বিজ্ঞানীরা বেশ উঠেপড়ে লেগেছেন। বিশেষ করে ফ্রান্সের একটি স্টার্ট আপ, ‘তপি অর্গানিক’ আবাদি জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে মানুষের মূত্র থেকে পরিবেশবান্ধব সার উৎপাদনে অনেকখানি এগিয়ে আছে।

রাসায়নিক সার আর সেইসঙ্গে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মল-মূত্র পরিবেশদূষণের একটি বড় কারণ। রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির অম্লত্ব বৃদ্ধি পায়, ভূত্বক আর্দ্রতা হারিয়ে রুক্ষ হয়। ফলে মাটিতে জৈব উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয়। এছাড়াও সরাসরি জমির উর্বরতায় অনেক অবদান রাখে এমন সব উপকারী প্রজাতির অণুজীব হ্রাস পায়। বিশেষ উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, কৃষকের বন্ধু কেঁচো সে মাটিতে বাঁচতে পারে না। পানিদূষণের ফলে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ এবং প্রাণী, বিশেষ আমাদের দেশের কিছু মাছ ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং আরো কিছু মাছ বিলুপ্তির পথে।


অন্যদিকে বাস্ত্ততন্ত্রের ভারসাম্য বিনষ্টকারী ক্ষতিকর জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর আধিক্য দেখা দেয়। এককথায়, রাসায়নিক সারের অত্যধিক ব্যবহারে মাটির বেশ ক্ষতি হয় এবং পর্যায়ক্রমে মাটির উর্বরতা পুরোপুরি লোপ পায়। আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতন, ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ বৃদ্ধি পায় এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ঘটায়। এমন দূষণ জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু-পরিবেশ এবং আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেক্ষেত্রে মূত্র থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাসিয়াম আলাদা করে নিয়ে সার হিসাবে ব্যবহার করতে পারলে তা হবে একাধারে অতিমাত্রায় পরিবেশবান্ধব এবং অর্থ সাশ্রয়ী। যাতে করে খুব সহজে প্রস্রাব সংগ্রহ করা যায়, ‘তপি অর্গানিক’ তাই নতুন নকশার ভবিষ্যত্ শৌচাগার তৈরি করেছে এবং পরীক্ষামূলক পর্যায়ের বেশ কিছু হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শৌচাগার স্থাপন করেছে। সে শৌচাগারগুলোতে মল ও মূত্র মিশ্রিত না হয়ে আলাদাভাবে পৃথক ট্যাংকে জমা হয়! সেখান থেকে মূত্র সংগ্রহ করে তা বেশ কয়েকটি ধাপে প্রক্রিয়াজাত করার পর কৃষিজমিতে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। এ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপটি হচ্ছে নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ। অর্থাৎ অণুজীবের প্রভাবে নাইট্রোজেন যৌগ ইউরিয়া যাতে উদ্বায়ী অ্যামোনিয়াতে রূপান্তরিত না হতে পারে সে ব্যবস্থা করা। এর পর মূত্রকে দুর্গন্ধমুক্ত করা এবং এর থেকে পানি নিষ্কাশন করে আয়তনে কমিয়ে আনা।

নাইট্রোজেন সংবদ্ধকরণে পারদর্শী বেশ কিছু প্রজাতির উপকারী ব্যাকটেরিয়া খুঁজে বের করা হয়েছে। এসব ব্যাকটেরিয়া অর্থকরী উদ্ভিদকে নাইট্রোজেন সংবদ্ধকরণে সহায়তা করে, উদ্ভিদের দ্রুত বৃদ্ধি এবং অধিক ফলন নিশ্চিত করে। এসব ব্যাকটেরিয়া মানব মূত্র থেকেই উপাদান সংগ্রহ করে অতি দ্রুত সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম। মানব মূত্র থেকে উৎপাদিত সারকে আরো বেশি উপযোগী করে তুলতে তাতে অনেকটা সহজেই এসব ব্যাকটেরিয়া সারের সঙ্গে ব্যবহার করে জমির উর্বরতা বাড়াতে বেশ চমকপ্রদ ফল পাওয়া গেছে। সবশেষে জমিতে সার হিসাবে ব্যবহারের আগে সঠিকভাবে সংরক্ষণের উপায় বের করা। এসব ধাপ মোটেই তেমন জটিল নয়। ‘তপি অর্গানিক’ তা প্রমাণ করেছে। অন্যদিকে আরেকদল বিজ্ঞানী অন্যকথা শোনাচ্ছেন। তাঁদের কথা হলো, মূত্র থেকে সকল বর্জ্য আলাদা করলে যে পানি পাওয়া যাবে, মানুষ তা নির্দ্বিধায় পান করতে পারবে বা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করতে পারবে। বর্তমানে এই গ্রহের মানুষরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার কোটি লিটারেরও বেশি মূত্র ত্যাগ করে থাকে। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, এই পরিমাণ মূত্র দিয়ে অলিম্পিকের বিশাল আকারের চার হাজারেরও বেশি সুইমিং পুল অনায়াসে পূর্ণ করা যায়। সুতরাং পানের পানির একটি নতুন উৎস হতে পারে এই বিপুল পরিমাণ মূল্যবান তরল। শুধু কথায় নয়, আমেরিকার মহাকাশ সংস্থা, নাসার বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। তাঁরা আপাতত এমন সুপেয় পানি শুধু নভোচারী এবং মরুযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন। ভবিষ্যতে প্রয়োজন পড়লে, অন্যত্র তা কাজে লাগানো যেতে পারে।

বর্তমানে পরিবেশ-জলবায়ু পরিবর্তন মানুষকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে। আর তাই নানাভাবে চেষ্টা করছে এর থেকে পরিত্রাণ পেতে। তবে মানব মূত্রকে মানবকল্যাণে কাজে লাগাবার ধারণাটি নতুন নয়। আমাদের দেশেও অনেক মেধাবী বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদ আছেন। এঁদের মধ্যে একদল এ নিয়ে বহু আগেই বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে বিশেষ করে উল্লেখ করা যেতে পারে, কুমিল্লার বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি মল থেকে মূত্রকে আলাদা করে বিশেষ ধরনের শৌচাগার উদ্ভাবন করেছে। পরে সেই মল বা মূত্রকে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে কৃষিক্ষেত্রে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা বাহুল্য হবে না, প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের বহু নগরে লন্ড্রিগুলোতে বস্ত্র, কাপড়, উল, ইত্যাদি পরিষ্কারের জন্য ডিটারজেন্ট অর্থাৎ পরিষ্কারক হিসাবে মানুষের মূত্র ব্যবহার করা হতো এবং তা ক্রয়-বিক্রয় হতো। আর সে কারণেই তখনকার রাজ্য প্রশাসন মূল্যবান পণ্য জ্ঞানে মূত্র ক্রয়-বিক্রয়ের উপর কর আরোপ করেছিল। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই মানব সৃষ্ট হালকা সোনালি রঙের তরলটি মানবকল্যাণে কাজে লাগানোর জন্য যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছেন, তাতে যে অচিরেই এর উপর আবারো যে রাজস্ব আরোপ হবে, সে আশঙ্কা করা মোটেই অমূলক নয়। আর ইতিমধ্যেই গবেষক-বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলতে শুরু করেছেন, মানব মূত্র বর্জ্য নয়, সম্পদ।

লেখক: ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক

সূত্র: ইত্তেফাক



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top