কেউ জানেন না কবে পাওয়া যাবে ‘স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স’

রাজটাইমস ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৯:৩৭; আপডেট: ২৮ জানুয়ারী ২০২৩ ১৮:২৮

ছবি: সংগৃহীত

সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং দ্রুতগতিতে গ্রাহকের হাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে দেওয়ার জন্য চালু করা হয় ডিজিটালাইজড ‘স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স’। কিন্তু স্মার্ট কার্ডের আবেদনের পর প্রায় দুই বছর পার হলেও অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়নি গ্রাহকদের। তাদের অভিযোগ প্রয়োজনীয় ফি, ছবি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট জমা দেওয়ার পরও স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্সের দেখা মিলছে না।

গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, বিআরটিএ স্মার্ট লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রাখায় চালকদের ভোগান্তির সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতেও তারা আবেদন করতে পারছেন না। পাশাপাশি বিদেশগামী চালকরাও আছেন দুর্ভোগে। এদিকে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দ্রুত স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহের নির্দেশ দিলেও তার ফল পাচ্ছেন না গ্রাহকরা।

জানা গেছে, বিআরটিএ স্মার্ট লাইসেন্স প্রদান প্রকল্পের চুক্তিবদ্ধ সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের কারণেই এই ভয়াবহ ভোগান্তি। প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির এক বছরেও বিআরটিএ-কে স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স সরবরাহ করতে পারেনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে বিআরটিএ ও ১৫ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রত্যাশী।

স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স এর ভোগান্তি নিয়ে রাজধানীর লালবাগের বাসিন্দা তাসলিম হোসাইন রনি জানান, গত বছরের আগস্টে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য টাকা, ছবি ও ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়েছিলেন। ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া কথা ছিল গত বছরেরই নভেম্বর মাসে। একনলেজমেন্ট স্লিপের মেয়াদ শেষ হলে বিআরটিএ থেকে মেয়াদ বাড়িয়ে নিচ্ছি। কবে লাইসেন্স পাবো তাও জানি না।

বিআরটিএ-এর মিরপুর শাখার উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শফিকুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বিআরটিএ থেকে গ্রাহকদের একনলেজমেন্ট স্লিপ দিচ্ছি। যা সড়কে চলাচলের সময় অস্থায়ী অনুমতিপত্র হিসেবে দেখানো যাবে। এই স্লিপের সাধারণ মেয়াদ দেওয়া থাকে। তবে, মেয়াদ শেষ হলে নতুন করে ১ বছরের জন্য মেয়াদ বাড়িয়ে দিচ্ছি।

স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবার বিষয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, ২ বছর আগে লাইসেন্সের জন‌্য আবেদন করেছি। এখন পর্যন্ত হাতে পাইনি। কবে সার্ভার চালু হবে, কবে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবো, তাও জানি না। সাময়িকভাবে চলাচলের জন্য বিআরটিএ থেকে একনলেজমেন্ট স্লিপ দেওয়া হচ্ছে। তবে, এই স্লিপ খুব সাধারণ কাগজের হওয়ায় সবসময় সঙ্গে রাখা যায় না। প্রায় ছিঁড়েও যায়। একনলেজমেন্ট স্লিপের মেয়াদ শেষ হলে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিয়ে দেয়। এভাবে হয়রানি করার কোনো মানে হয় না।

স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স-এর এই ব্যর্থতার কারণে বিআরটিএ’র ভাবমূর্তিও ম্লান হয়ে গেছে। বছর খানেক আগে আবেদন ও পরীক্ষায় পাস করেও যারা লাইসেন্স পাননি তাদের দুই তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ১০ লক্ষ চালক গাড়ি চালাচ্ছেন বিআরটিএ’র ‘একনলেজমেন্ট স্লিপ’ দিয়ে। স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড না পাওয়ায় সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারছেন না তারা। শুধু তাই নয় এর কারণে দুই বছর ধরে বাংলাদেশ দক্ষ চালক রপ্তানিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে অন্যান্য দেশ সে স্থান দখল করে নিচ্ছে।

জানা যায়, ২০২০ সালের ২৯ জুলাই ভারতীয় কোম্পানি মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে পাঁচ বছরে ৪০ লক্ষ স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহের শত কোটি টাকার চুক্তি সই করে বিআরটিএ।

এ চুক্তিতে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেডের বাংলাদেশি এজেন্ট লজিক ফোরাম। চুক্তি অনুসারে ২০২০ সালের ২৯ জুলাই থেকে দুই মাসের মধ্যে প্রিন্ট করা স্মার্ট লাইসেন্স কার্ড সরবরাহ করার কথা। করোনা পরিস্থিতির কারণে সেই সময় বৃদ্ধি করে সাড়ে চার মাস করা হয়। সে হিসেবে গত ডিসেম্বর থেকে প্রিন্ট করা স্মার্ট লাইসেন্স কার্ড সরবরাহ করার কথা মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স-এর। কিন্তু জুলাই থেকে এক বছরেও বিআরটিএ-কে সময়মত স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি ড্রাইভিং লাইসেন্সের নমুনাও দেখাতে পারেনি সংস্থাটি।

পরে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স এখন পর্যন্ত সেন্ট্রাল এনরোলমেন্ট স্টেশন স্থাপনের কাজই শেষ করতে পারেনি। এখনও জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি বিভিন্ন জেলায়। স্টেশন স্থাপনের কাজেও শর্ত না মানার অভিযোগও আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ’র পরিচালক (প্রকৌশল) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস গণমাধ্যমকে জানান, নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েছে পরীক্ষামূলক ভাবে। পুরনো প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটি বাংলাদেশ লিমিটেডের সঙ্গে বিআরটিএ’র চুক্তি আগামী জুন অবধি বহাল আছে। ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে নতুন প্রতিষ্ঠান স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের সরবরাহ স্বাভাবিকভাবে শুরু করবে বলে আশা করছি। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া অন্যান্য দিনে বিদেশ যাবার মত জরুরি দরকারে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বিআরটিএ’র সব জেলার দফতরে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ড্রাইভিং লাইসেন্স বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি- ‘বিআরটিএ’-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন গুণগত এবং স্মার্ট কার্ডের বৈশিষ্ট্য যা যা থাকার কথা তার কোনটির সঙ্গে আপস করা যাবে না। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর যেন না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যানকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে মনিটর করতে হবে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে দ্রুত কার্ড সংগ্রহ করে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে গতি ফিরিয়ে আনতে হবে এবং মানুষের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে হবে।

দেশজুড়ে গাড়ি চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্বাভাবিক সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে। এরপর থেকে সংকটের মাত্রা অতিক্রম করেই চলেছে। টাইগার আইটি বাংলাদেশ লিমিটেডের সঙ্গে বিআরটিএ’র চুক্তি আছে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। চুক্তির মেয়াদ থাকলেও চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সরবরাহ শেষ হয় ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে। মধ্যবর্তী সংকট মোকাবিলায় প্রায় এক বছর আগে চিঠি দিয়ে বিআরটিএকে আগাম সতর্ক করেছিল টাইগার আইটি বাংলাদেশ লিমিটেড। ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গভীর সংকটের মুখে বিআরটিএ এর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমানকে সরে যেতে হয়েছিল।

এদিকে বিভিন্ন দেশে নিষেধাজ্ঞায় রয়েছে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স। এমনকি তাদের নিজ দেশ ভারতেও নাগরিকদের তথ্য বিক্রির অভিযোগে আধার কার্ড প্রকল্পে আজীবন নিষিদ্ধ তারা। বের করে দেওয়া হয় তেলেঙ্গানার সামাজিক সুরক্ষা সেবা ‘মিসেভা’ প্রকল্প থেকেও। ভবিষ্যতেও ভারতের কোনও টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না কোম্পানিটি। দুর্নাম কুড়িয়েছে ভারতের বাইরে কেনিয়া, শ্রীলঙ্কাতেও। মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের ব্যর্থতা বাংলাদেশেও নতুন কোন ঘটনা নয়। ২০১৫ সালে বিএমইটির ইমিগ্রেশন কার্ড সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েও ব্যর্থ হয়েছিল মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স।

সূত্র: ইত্তেফাক/এএস



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস
এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top