দানিল খার্মস : অ্যাবসার্ড সাহিত্যের পথিকৃৎ

রাজ টাইমস | প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২২ ১৯:৪৫; আপডেট: ২৮ জুন ২০২২ ১১:৩৬

ছবি: সংগৃহীত

দানিল খার্মস অ্যাবসার্ড ধারার কবি, লেখক ও একজন নাট্যকার। ১৯০৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২৮ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে যুক্তির কঠোর নিয়ম-নীতিতে বন্দী শিল্পর বিপরীতে অবস্থান নেয়া তৎকালীন লেখক ও শিল্পীদের ওবেরিউ (OBERIU) বা এসোসিয়েশন অফ রিয়েল আর্ট আন্দোলনের পথিকৃতদের একজন তিনি।

খার্মসের ত্রিশ বছরের জীবনে শিশুদের জন্য লেখা রাশিয়ায় প্রকাশিত হলেও, অন্য কোন লেখা তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয় নাই। অপ্রকাশিত রচনার পাণ্ডুলিপি আগলে রেখেছিলেন তারই এক বন্ধু। প্রায় দু'দশক পর একদল তরুণ-তরুণীর চেষ্টায় একটি-দুটি করে ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকে।

খার্মসের প্রতি সোভিয়েত-বিরুদ্ধ কার্যক্রমের অভিযোগ আনা হয় ১৯৩১ সালে। এবং তাকে লেনিনগার্দ থেকে বিতাড়িত করা হয়। ১৯৪১ সালে খার্মসকে পুনরায় আটক করা হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে 'পরাজয়-সুলভ' বিবৃতি দেয়ার জন্য। আটকের পর একটা কয়েদ হাসপাতালের মানসিক রোগীদের ওয়ার্ডে বন্দী করে রাখা হয় ৮৭২ দিন। পরের বছর ১৯৪২ সালে লেনিনগ্রাদে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে ১ ফেব্রুয়ারি অ্যাবসার্ড সাহিত্যের অন্যতম এই লেখকের মৃত্যু ঘটে।

১৯৭০ এর দশকের শেষ দিকে দানিল খার্মসের কাব্যিক, ব্যঙ্গাত্মক, অ্যাবসার্ড, শক্তিশালী সৃষ্টিসমূহ সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রকাশ পেতে শুরু করে। অনেক সাহিত্য সমালোচকই অ্যাবসার্ড সাহিত্যের আলোচনায় দানিল খার্মসের সাথে স্যামুয়েল বেকেট, আলবেয়ার ক্যামুর তুলনা করে থাকেন।

লম্বা চুল, দীর্ঘকায় খার্মসের ছিল শার্লক হোমসের প্রতি প্রচণ্ড মোহ। তাই তাকে প্রায় সময় দেখা যেতো ব্রিটিশ স্টাইলের জ্যাকেট পরতে। অন্যদিকে, তার ঘরভর্তি বইয়ের সিংহভাগ দখল করে রেখেছিল কালো জাদু, অতিপ্রাকৃত চিহ্নের উপর লেখা বইয়ে। তিনি বাচ্চাদের জন্য ১২ টি গল্পের বই লিখেছিলেন এবং স্যামুইল মার্শাক নামের একজন প্রকাশকের আওতাধীন বাচ্চাদের বই নিয়ে কাজও করেছিলেন।

নিজের শুরুর দিককার কবিতায় খার্মসকে কৌশল ও গঠন নিয়ে নিরীক্ষা করতে দেখা যায়। এরকমই এক নিরীক্ষা ছিল শুধুমাত্র শব্দ দিয়ে অর্থ তৈরির প্রচেষ্টা। তার লেখা স্বল্প পরিসরের ছোট গল্পে দানিল খার্মসকে দেখা যায় সাধারণ যুক্তি এবং পরিচিত বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করতে।

ফর্মালিজম ও নিরীক্ষাধর্মী শিল্প সমাজতান্ত্রিক শিল্প ভাবনার পরিপন্থী বলে ১৯৩১ সালে দানিল খার্মসকে সমাজতন্ত্র-বিরুদ্ধ কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগে খার্মস অঞ্চলে নির্বাসিত করা হয়। কয়েক মাস নির্বাসনে থেকে দানিল খার্মস লেনিনগার্দে ফিরে আসেন এবং ১৯৩৪ সালে তিনি সোভিয়েত লেখক ইউনিয়নের সদস্য হোন।

১৯৩৩ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যকার সময়তে বেশ কিছু গল্প লেখে দানিল খার্মস, যেগুলোকে সে 'ইনসিডেন্টস' নাম দিয়েছিলেন। গল্পগুলোতে গোগো ও পুশকিনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার সাথে সাথে স্বৈরশাসন ব্যবস্থার বাস্তবতা তুলে ধরেন খার্মস। প্রথমবারের মত এই গল্পগুলো (যেগুলোর কোন কোন গল্প ১০ বাক্যেরও কম পরিসরের) ১৯৮৮ সালে অর্থাৎ দানিল খার্মসের মৃত্যুর ৪৬ বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রকাশ পায়।

১৯৩৭-৩৮ সালে দানিল খার্মসের কোন প্রকার লেখা যাতে প্রকাশ না পায় সেজন্য তৎকালীন সোভিয়েত সরকার তার লেখা প্রকাশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই সময়ে লেখা নিজের নোটবুকে একটা কবিতায় খার্মসকে "আর এভাবেই ক্ষুধা-তৃষ্ণার শুরু হয়", "ছিন্নভিন্ন হওয়ার পথে আমার যাত্রা"র মত বাক্য লিখতে দেখা গেছে।

খার্মসের সবচে' দীর্ঘ পরিসরের কাজ হচ্ছে 'The Old Woman' নামের একটি নভেলা। এই নভেলার উপজীব্য হচ্ছে গল্পের কথক একজন লেখক যে নিজের বাসায় একজন বৃদ্ধ নারীর মৃতদেহ আবিষ্কার করেন। লেখক স্বপ্ন এবং বাস্তবতার ভিতর পার্থক্য করতে ক্রমাগত ব্যর্থ হতে থাকে। পরাবাস্তবতায় মোড়ানো এই গল্পে বৃদ্ধ নারী উপস্থিত হয় অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী হিসেবে। লেখক বারবার চায় বৃদ্ধ নারীকে বাইরে কোন ডোবায় ফেলে আসতে। কিন্তু পারেনা। শেষমেশ গল্পের কথককে দেখা যায় সেই স্যুটকেসটা হারিয়ে ফেলতে যার ভিতর সে বৃদ্ধ নারীর লাশকে লুকিয়ে রেখেছিল।

দানিল খার্মসের লেখায় বারবার ক্ষুধা এবং দরিদ্র এসেছে। অনেকে সেজন্য তাকে ক্ষুধার কবিও বলে থাকেন। খার্মস নিজের লেখা যেসব ছোট গল্পকে 'ইনসিডেন্টস' নাম দিয়েছিলেন সেসব গল্পের একটি '২ নং নীল নোটবুক'। গল্পটা অনুবাদ এরকম হয়-

''একদা লাল চুলের একজন মানুষ ছিল। যার কোন চোখ ছিলনা৷ ছিলনা কোন কান। ও! তার কোন চুলও ছিলনা- তাহলেতো লোকে শুধুমাত্র বলার জন্যই বলতো যে সে ছিল লাল চুলের একজন মানুষ!

সে কথা বলতে পারতোনা, কারণ তার মুখ ছিলনা। ছিলনা কোন তার নাকও।

তার এমনকি কোন হাত, পা, পেট- কিছুই ছিলনা। কেউ তাকে কখনো বলতো না যে শিরদাঁড়া শক্ত করে দাঁড়াতে। কিভাবে বলবে? তার না ছিল পিঠ, না পা। তার কোন নাড়ীভুঁড়ি ছিলনা, আদতে তার কিচ্ছুই ছিলনা। তাই আমরা যে আসলে কার সম্পর্কে কথা বলছি তা বোঝা বেশ কঠিন হয়ে পড়লো।''



বিষয়:


বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top